Ad
Advertisement
Doctor TV

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫


জ্বর, ফুসকুড়ি, শরীর ব্যথা হলেই সবসময় ডেঙ্গু নয়

Main Image

ছবিঃ প্রতীকী


ডেঙ্গু-প্রবণ এলাকায় এমন উপসর্গ দেখা দিলে বেশিরভাগ মানুষ প্রথমেই ধরে নেন এটি ডেঙ্গু। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন এই ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ডেঙ্গুর মতো প্রায় একই লক্ষণ নিয়ে আরও অনেক রোগ দেখা দেয়, যাদের বলা হয় ‘ডেঙ্গু মিমিকার’ বা ডেঙ্গুর মতো রোগ। এদের সঙ্গে ডেঙ্গু গুলিয়ে ফেললে সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে, এমনকি জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে।

 

এই রোগগুলোর অনেকগুলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী দ্বারা হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা পদ্ধতি ডেঙ্গুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কিছু রোগ আবার সময়মতো ধরা না পড়লে ডেঙ্গুর চেয়েও বেশি মারাত্মক হতে পারে। উপসর্গের মিলের কারণে সঠিকভাবে শনাক্ত করা বিশেষত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় কঠিন হয়ে পড়ে, যখন ডাক্তার এবং রোগী দু’পক্ষের মনেই ডেঙ্গুর আশঙ্কা প্রবল থাকে। তাই এসব ডেঙ্গু সদৃশ রোগ সম্পর্কে জানা এবং পার্থক্য বোঝা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

 

ভাইরাসজনিত ডেঙ্গু মিমিকার

কয়েকটি ভাইরাস ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ তৈরি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস: জ্বর, ফুসকুড়ি ও তীব্র জয়েন্টের ব্যথা হয় অনেক সময় জয়েন্ট ফুলে যায়, যা ডেঙ্গুর তুলনায় বেশি হতে পারে।

জিকা ভাইরাস: জ্বর ও ফুসকুড়ির পাশাপাশি চোখ লাল হয়ে যায় (কনজাংটিভাইটিস)। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।

ঋতুকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু): উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা ও মাংসপেশিতে ব্যথা যা ডেঙ্গুর মতোই কিন্তু সাধারণত এর সঙ্গে কাশি ও গলা ব্যথার মতো শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ থাকে।

এই ভাইরাসগুলো প্রায়ই ডেঙ্গুর মতো একই এলাকায় এবং একই মৌসুমে ছড়িয়ে পড়ে, তাই চিকিৎসা শুরুর আগে ল্যাবরেটরি টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ব্যাকটেরিয়াজনিত ডেঙ্গু মিমিকার

কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে

লেপ্টোস্পাইরোসিস: প্রাণীর মূত্রে দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ায়। উচ্চ জ্বর, মাংসপেশিতে ব্যথা ও চোখ লাল হওয়া—সবই ডেঙ্গুর মতো। তবে লেপ্টোস্পাইরোসিসে কিডনি ও লিভার দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে, তাই দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি।

টাইফয়েড জ্বর: স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, পেটের অস্বস্তি ও দুর্বলতা ডেঙ্গুর মতো, তবে এর জ্বর ধীরে ধীরে বাড়ে এবং হজমের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে।

এই রোগগুলোতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, তাই ডেঙ্গু ভেবে চিকিৎসা করলে জীবনহানি হতে পারে।

 

পরজীবী ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ

ম্যালেরিয়া: প্লাজমোডিয়াম পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট। জ্বর সাধারণত চক্রাকারে হয়—উচ্চ জ্বর, ঠান্ডা লাগা, অতিরিক্ত ঘাম। এছাড়া রক্তাল্পতা, দুর্বলতা ও কখনও জন্ডিসও হতে পারে। সময়মতো শনাক্ত করে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ না দিলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।

অন্যান্য পরজীবী সংক্রমণ, যেমন গুরুতর সিস্টেমিক অ্যামিবায়াসিস, কখনও কখনও ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে, যদিও এগুলো তুলনামূলক বিরল।

 

অসংক্রামক ডেঙ্গু মিমিকার

সবসময় ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ সংক্রমণের কারণে হয় না

হেপাটাইটিস এ, বি ও ই: লিভারের প্রদাহের কারণে জ্বর, ক্লান্তি ও ত্বকে দাগ বা রঙ পরিবর্তন হতে পারে।

অটোইমিউন রোগ যেমন সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমাটোসাস (SLE) জ্বর, জয়েন্টের ব্যথা ও ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে, যা ডেঙ্গুর সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে।

এসব রোগ শনাক্তে লিভার ফাংশন টেস্ট বা অটোঅ্যান্টিবডি টেস্টের মতো নির্দিষ্ট পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।

 

ডেঙ্গু মিমিকার চেনা কেন জরুরি

১। ভুল নির্ণয়ের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে

২। ম্যালেরিয়াকে ডেঙ্গু ভেবে চিকিৎসা করলে সময়মতো অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না।

৩। লেপ্টোস্পাইরোসিস দ্রুত শনাক্ত না হলে কিডনি বা লিভারে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

 

ডেঙ্গুপ্রবণ অঞ্চলে চিকিৎসকদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে, সম্ভাব্য সব রোগ বিবেচনায় নিতে হবে এবং যতটা সম্ভব ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। রোগীদেরও বোঝা জরুরি—শুধু জ্বর ও শরীর ব্যথা মানেই ডেঙ্গু নয়। সঠিক পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

 

সবশেষে, ডেঙ্গু মিমিকার সম্পর্কে সচেতনতা শুধু চিকিৎসাগত নিখুঁততার জন্য নয়—এটি জীবন রক্ষার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন