Back to home

শুধু তোকমা বীজই কোলেস্টেরল কমাতে পারে?

সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে হার্ভার্ডের চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও তোকমা বীজের সম্ভাব্য উপকার নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।

ড

ডক্টর টিভি রিপোর্ট

August 16, 2026

শুধু তোকমা বীজই কোলেস্টেরল কমাতে পারে?
ছবি: সংগৃহীত

গরমের দিনে এক গ্লাস শরবত বা পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া ছোট কালো বীজ অনেকেরই পরিচিত। তোকমা বীজ, যাকে অনেক জায়গায় সাবজা বীজও বলা হয়, এখন শুধু শরবতের উপকরণ নয়, স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবেও জনপ্রিয় হচ্ছে।

ওজন কমানো, কোষ্ঠকাঠিন্য কমানো, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে কোলেস্টেরল কমানোর মতো নানা উপকারের কথা তোকমা বীজ নিয়ে বলা হয়। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে হার্ভার্ডের চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও তোকমা বীজের সম্ভাব্য উপকার নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তোকমা বীজ খেলেই কি কোলেস্টেরল কমে যায়?

উত্তর হলো, না। বিষয়টি এত সরল নয়। তোকমা বীজে আঁশ রয়েছে এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু তোকমা বীজকে কোলেস্টেরল কমানোর চিকিৎসা হিসেবে দেখার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো নেই।

তোকমা বীজে কী আছে?

তোকমা বীজ তুলসীজাতীয় একটি উদ্ভিদের বীজ। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর চারপাশে জেলির মতো আস্তরণ তৈরি হয়। এ কারণেই ভেজানো সাবজা বীজ দেখতে কিছুটা ফুলে ওঠে।

বাথরুমে স্ট্রোক হওয়ার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
আরও পড়ুন বাথরুমে স্ট্রোক হওয়ার কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

এই বীজে খাদ্যআঁশ রয়েছে। পানিতে ভিজলে যে জেলির মতো অংশ তৈরি হয়, তার একটি বড় অংশই আঁশজাতীয় উপাদান। এছাড়া এতে কিছু খনিজও রয়েছে। প্রতিবেদনে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লৌহের মতো খনিজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তোকমা বীজকে কোনো অলৌকিক খাবার ভাবার কারণ নেই। একটি খাবারে কিছু উপকারী উপাদান থাকলেই সেটি সব ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দূর করতে পারে না।

কোলেস্টেরল কমাতে আঁশের ভূমিকা কী?

এখানেই তোকমা বীজের সম্ভাব্য উপকারের বিষয়টি আসে। খাদ্যআঁশের কিছু ধরন, বিশেষ করে পানিতে দ্রবণীয় আঁশ, শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণার সমন্বিত ফলাফলেও দেখা গেছে, দ্রবণীয় আঁশ গ্রহণ করলে মোট কোলেস্টেরল এবং ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে।

এর একটি কারণ হলো, দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে। এটি হজমের সময় কিছু উপাদান আটকে রাখতে পারে এবং শরীরের কোলেস্টেরল ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

শৈশবে চিনি বেশি খেলে বাড়ে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি
আরও পড়ুন শৈশবে চিনি বেশি খেলে বাড়ে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। দ্রবণীয় আঁশ কোলেস্টেরল কমাতে পারে, এই প্রমাণ আর তোকমা বীজ খেলেই কোলেস্টেরল কমবে, এই দুই কথা এক নয়। তোকমা বীজ নিয়ে সরাসরি মানুষের ওপর বড় পরিসরের গবেষণা এখনো সীমিত।

তাহলে তোকমা বীজের কোলেস্টেরল কমানোর দাবি কতটা সত্য?

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো, সম্ভাবনা আছে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় তুলসীজাতীয় উদ্ভিদের বীজের জেলির মতো আবরণ নিয়ে পরীক্ষাগারে গবেষণা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এই আবরণ পানিতে ফুলে ওঠে এবং পরীক্ষাগারের পরিবেশে কিছু চর্বি আটকে রাখতে পারে।

এটি আকর্ষণীয় ফল হলেও মনে রাখতে হবে, এটি মানুষের শরীরে করা গবেষণা নয়। পরীক্ষাগারে কোনো উপাদান চর্বি আটকে রাখতে পারলেই মানুষের রক্তের কোলেস্টেরল কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মানুষের ওপর বড় ও ভালোভাবে পরিচালিত গবেষণা প্রয়োজন।

ওজন কমাতে কি সাহায্য করতে পারে?

তোকমা বীজ পানিতে ভিজলে অনেকটা ফুলে যায়। এতে পেট কিছুটা ভরা লাগতে পারে। ফলে কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

প্রতিবেদনে চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও তোকমা বীজের এই বৈশিষ্ট্যকে ওজন নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে শুধু তোকমা বীজ খেলেই ওজন কমবে, এমন নয়। ওজন কমানোর মূল বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ না করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের উপকারিতা নিয়ে গবেষণা যা বলছে
আরও পড়ুন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের উপকারিতা নিয়ে গবেষণা যা বলছে

কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকার হতে পারে তোকমা বীজের আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে। আঁশ অন্ত্রে পানির পরিমাণ ধরে রাখতে এবং মলকে নরম করতে সহায়তা করে। তবে পর্যাপ্ত পানি না খেলে বেশি আঁশ খাওয়ার উল্টো ফলও হতে পারে। তাই তোকমা বীজ খেলে পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তে শর্করার ওপর কি প্রভাব আছে?

তোকমা বীজ রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, এমন কথাও প্রচলিত। এর পেছনে আঁশের ভূমিকা থাকতে পারে। আঁশযুক্ত খাবার হজম ও শর্করা শোষণের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।

কিন্তু এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। তোকমা বীজকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না। ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ, খাবারের নিয়ম এবং শরীরচর্চা চালিয়ে যেতে হবে।

কীভাবে খাবেন?

তোকমা বীজ সাধারণত শুকনো অবস্থায় না খাওয়াই ভালো। পানিতে ভিজিয়ে নিলে বীজ ফুলে নরম হয়ে যায়। প্রতিদিন এক থেকে দুই চা-চামচ তোকমা বীজ পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া যায়। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এ বীজ ফুলে যায়। এরপর পানি, শরবত, দই বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে এটি খাওয়া যায়। তবে সবার জন্য একই পরিমাণ উপযুক্ত হবে, এমন নয়।

শুকনো তোকমা বীজ খাওয়া কেন ঠিক নয়?

শুকনো তোকমা বীজ পানি শোষণ করে ফুলে ওঠে। তাই শুকনো অবস্থায় বেশি পরিমাণে খেলে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। একই সঙ্গে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তিও হতে পারে।

কোন গ্রুপের রক্তে কোন রোগের ঝুঁকি বেশি
আরও পড়ুন কোন গ্রুপের রক্তে কোন রোগের ঝুঁকি বেশি

প্রতিবেদনে অতিরিক্ত সাবজা বীজ খেলে পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। তাই প্রথমবার খেলে অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করা এবং ভালোভাবে ভিজিয়ে খাওয়াই নিরাপদ।

কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু তোকমা বীজ খেলে হবে?

না। কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কমানো এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় দ্রবণীয় আঁশের কোলেস্টেরল কমানোর কিছু উপকার দেখা গেলেও সেই প্রভাব সাধারণত সীমিত। অর্থাৎ, তোকমা বীজ একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, কিন্তু কোলেস্টেরল কমানোর একমাত্র উপায় নয়।

কোলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করা যাবে?

একেবারেই নয়। কেউ যদি কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খান, শুধু তোকমা বীজ খাওয়া শুরু করে নিজের ইচ্ছায় সেই ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।

কারণ রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকার সঙ্গে হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির নানা সমস্যার ঝুঁকি জড়িত। ওষুধ প্রয়োজন কি না, সেটি নির্ভর করে কোলেস্টেরলের মাত্রা, বয়স, অন্যান্য রোগ এবং সামগ্রিক হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির ওপর। তাই নিয়মিত ওষুধ চললে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তা পরিবর্তন করা ঠিক নয়।

কারা তোকমা বীজ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

যাদের গিলতে সমস্যা হয়, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ ভেজানো বীজ ফুলে ওঠে। এ ছাড়া যাদের হজমের সমস্যা বা অতিরিক্ত পেট ফাঁপার প্রবণতা রয়েছে, তারা অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করতে পারেন।

কোনো নির্দিষ্ট রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খেলে বা বিশেষ খাদ্যনিয়ম মেনে চললে খাদ্যতালিকায় নিয়মিত তোকমা বীজ যোগ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তোকমা বীজ ছোট হলেও এতে খাদ্যআঁশসহ কিছু উপকারী উপাদান রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এটি খাওয়া যেতে পারে।

এর আঁশ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করতে পারে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খাদ্যআঁশ নিয়ে করা গবেষণায় পাওয়া যায়।

কিন্তু তোকমা বীজ নিজে কোলেস্টেরল কমানোর শক্তিশালী প্রমাণিত উপায়, এমনটা এখনো বলা যাচ্ছে না। এ নিয়ে মানুষের ওপর আরও ভালো ও বড় গবেষণা প্রয়োজন।

তাই কোলেস্টেরল কমানোর জন্য শুধু এক গ্লাস তোকমা বীজের শরবতের ওপর ভরসা না করে পুরো খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোকমা বীজ হতে পারে স্বাস্থ্যকর খাবারের একটি ছোট অংশ, কিন্তু সুস্থ থাকার পুরো সমাধান নয়।

সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস

Share

আরও জানুন

বিদেশি দামি ফলের পরিবর্তে বহুগুণ পুষ্টি পাবেন যে ফলে
স্বাস্থ্য

বিদেশি দামি ফলের পরিবর্তে বহুগুণ পুষ্টি পাবেন যে ফলে

স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার মানেই যে বিদেশি বা দামি হতে হবে, এমন নয়। আমাদের হাতের কাছে থাকা পরিচিত পেয়ারা হতে পারে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম সেরা পুষ্টিকর বিকল্প।

ডেস্ক রিপোর্ট 26 Sep
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরও পেট ফাঁপার কারণ
স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরও পেট ফাঁপার কারণ

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে প্রায় ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া প্রয়োজন, যা ধাপে ধাপে পূরণ করা ভালো।

ডেস্ক রিপোর্ট 26 Sep
ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে যেসব অভ্যাসে
স্বাস্থ্য

ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে যেসব অভ্যাসে

ধূমপান না করলেও ফুসফুস পুরোপুরি নিরাপদ থাকে না। তামাকজাত পণ্যের আসক্তি না থাকলেও প্রতিদিনের কিছু অসতর্কতার কারণে ফুসফুস ক্ষতিকর ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। দীর্ঘদিন এই ধরনের পরিবেশের মধ্যে থাকলে ফুসফুসের নানা জটিলতার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

ডেস্ক রিপোর্ট 26 Sep
সুস্থ থাকতে কমান অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, মানতে হবে যেসব অভ্যাস
স্বাস্থ্য

সুস্থ থাকতে কমান অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, মানতে হবে যেসব অভ্যাস

নতুন এক গবেষণায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই খাবার বাছাইয়ের সময় শুধু স্বাদ বা সুবিধার কথা না ভেবে খাবারটি কতটা প্রক্রিয়াজাত, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

ডেস্ক রিপোর্ট 24 Sep