চিরুনি হাতে নিলেই উঠে আসছে একগুচ্ছ চুল। বালিশে, গোসলের সময় কিংবা কাপড়ের ওপরও চুল পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা হয়। অনেকে তখন নতুন কোনো তেল, শ্যাম্পু বা চুল গজানোর ওষুধ খুঁজতে শুরু করেন।
কিন্তু চুল পড়ার পেছনে সব সময় বড় কোনো রোগ বা বংশগত কারণ থাকে না। প্রতিদিন চুলের যত্ন নেওয়ার সময় আমরা যে কিছু সাধারণ ভুল করি, সেগুলোও চুল দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে চুলে অতিরিক্ত টান দেওয়া, বেশি তাপ ব্যবহার, ভেজা চুলে জোরে আঁচড়ানো, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং খাবারে পুষ্টির ঘাটতি চুলের ক্ষতি করতে পারে। তবে দিনে কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। সাধারণত একজন মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়তে পারে। সমস্যা হয় যখন চুল পড়ার পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়, মাথার কোনো অংশ পাতলা হয়ে যায় বা নতুন চুল গজানোর হার কমে যায়।
খুব শক্ত করে চুল বাঁধা
চুল শক্ত করে খোঁপা, পনিটেল, বেণি বা অন্য কোনোভাবে বাঁধার অভ্যাস থাকলে চুলের গোড়ায় নিয়মিত টান পড়ে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে চুল পড়ার একটি ধরন তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে টানজনিত চুল পড়া বলা হয়। শুরুতে কপালের দুই পাশ বা চুলের সামনের অংশ পাতলা হতে পারে। দীর্ঘদিন একইভাবে চুলে টান পড়তে থাকলে চুলের গোড়ায় স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে।
তাই চুল বাঁধার সময় খুব বেশি টান না দেওয়াই ভালো। প্রতিদিন একই জায়গায় শক্ত করে চুল বাঁধার বদলে মাঝেমধ্যে চুল খোলা রাখা যেতে পারে।
চুলে অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার

চুল শুকানোর যন্ত্র, চুল সোজা করার যন্ত্র বা চুল কোঁকড়ানোর যন্ত্র নিয়মিত ব্যবহার করলে চুল দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত তাপ চুলের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে চুল সহজে ভেঙে যায়। বিশেষ করে প্রতিদিন বেশি তাপমাত্রায় চুল শুকানোর অভ্যাস থাকলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। চুল ধোয়ার পর সম্ভব হলে স্বাভাবিকভাবে শুকাতে দিন। প্রয়োজন হলে কম বা মাঝারি তাপ ব্যবহার করুন।
ভেজা চুলে জোরে আঁচড়ানো
গোসলের পর ভেজা চুল তুলনামূলক দুর্বল থাকে। এ সময় জোরে চিরুনি চালালে চুল ছিঁড়ে যেতে পারে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ভেজা চুল যতটা সম্ভব কম নাড়াচাড়া করা। সোজা চুল হলে কিছুটা শুকিয়ে নেওয়ার পর চওড়া দাঁতের চিরুনি দিয়ে ধীরে ধীরে আঁচড়ানো ভালো। কোঁকড়ানো বা ঘন চুলের ক্ষেত্রে ভেজা অবস্থায় আঁচড়ানো প্রয়োজন হতে পারে, তবে তখনও চওড়া দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করে ধীরে কাজ করা উচিত।
তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে চুল শুকানো
গোসলের পর অনেকেই তোয়ালে দিয়ে চুল জোরে ঘষে পানি শুকান। এতে চুলের ওপর ঘর্ষণ তৈরি হয় এবং দুর্বল চুল ভেঙে যেতে পারে।
চুল ঘষে শুকানোর বদলে তোয়ালে বা নরম কাপড় দিয়ে আলতোভাবে পানি শুষে নেওয়া ভালো। চুল কিছুটা শুকিয়ে গেলে স্বাভাবিক বাতাসে শুকাতে দেওয়া যেতে পারে।
বারবার চুলে রং বা রাসায়নিক ব্যবহার
চুলে রং করা, চুল সোজা করা বা স্থায়ীভাবে কোঁকড়ানোসহ বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া চুলের গঠন দুর্বল করতে পারে।
বারবার এসব করলে চুল ভঙ্গুর হয়ে ভেঙে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চুলের গোড়ারও ক্ষতি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে চুল পড়া বাড়তে পারে। তাই চুলে নিয়মিত রাসায়নিক ব্যবহার না করাই ভালো। করতেই হলে দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে এবং চুল ও মাথার ত্বকের অবস্থা বিবেচনা করে করা উচিত।
অতিরিক্ত চুল আঁচড়ানো

চুল সুন্দর রাখতে অনেকে দিনে বারবার চিরুনি ব্যবহার করেন। কিন্তু অতিরিক্ত আঁচড়ানোও চুলের জন্য ভালো নয়। বিশেষ করে চিরুনি দিয়ে জোরে টান দিলে চুল ভেঙে যেতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি চুল যতটা প্রয়োজন ততটাই আঁচড়ানোর পরামর্শ দেয়। চুলের জট ছাড়াতে হলে নিচের দিক থেকে ধীরে ধীরে ওপরে আসা ভালো।
চুলে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার
চুল শক্ত করে রাখার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রসাধনী দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত ব্যবহার করলে চুল ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। এসব পণ্য ব্যবহারের পর চুল আঁচড়ানোর সময়ও চুল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্রতিদিন চুলে শক্তভাবে ধরে রাখে এমন প্রসাধনী ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে তা কমানো ভালো।
খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি
চুলের সুস্থতার জন্য শুধু বাইরে থেকে যত্ন নেওয়াই যথেষ্ট নয়। শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে চুলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে খাদ্যে লৌহ, প্রোটিন, দস্তা বা কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে চুল পড়া বাড়তে পারে। খুব কম ক্যালরি গ্রহণ করলেও উল্লেখযোগ্য চুল পড়া হতে পারে। তাই ওজন কমানোর জন্য হঠাৎ করে খুব কম খাওয়া বা একেবারে কোনো একটি খাদ্যগোষ্ঠী বাদ দেওয়া ঠিক নয়।
খাদ্যতালিকায় মাছ, ডিম, ডাল, দুধ ও দুধজাত খাবার, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও বীজসহ বৈচিত্র্যময় পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো।
দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকা
মানসিক চাপ শুধু মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কয়েক মাস পর হঠাৎ চুল বেশি পড়তে দেখা যেতে পারে। এ ধরনের চুল পড়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলা হয়। তীব্র মানসিক চাপ, গুরুতর অসুস্থতা বা শরীরের ওপর বড় ধরনের ধাক্কার পর অনেক চুল একই সময়ে বিশ্রামের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। কয়েক মাস পর সেই চুলগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে। ভালো খবর হলো, কারণটি নিয়ন্ত্রণে এলে অনেকের চুল আবার স্বাভাবিকভাবে গজাতে পারে। তবে হঠাৎ করে চুল পড়া বেড়ে গেলে কারণটি নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ধূমপানের অভ্যাস
ধূমপান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো চুলের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি বলছে, ধূমপানের সঙ্গে পুরুষদের টাক পড়ার সম্পর্ক থাকার কিছু প্রমাণ রয়েছে। ধূমপান পুরো শরীরে প্রদাহও বাড়ায়। তাই চুলের স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ধূমপান এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু চুলের যত্নের ভুলেই কি চুল পড়ে?

না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চুল পড়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি হলো বংশগত চুল পড়া। এ ছাড়া বয়স, হরমোনের পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা, কিছু রোগ, ওষুধ, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, পুষ্টির ঘাটতি এবং তীব্র মানসিক চাপও চুল পড়ার কারণ হতে পারে। তাই চুল পড়ছে দেখেই শুধু শ্যাম্পু বা তেল পরিবর্তন করা সব সময় যথেষ্ট নয়।
দিনে কতটা চুল পড়া স্বাভাবিক?
চুল পড়া মানেই সমস্যা নয়। একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়তে পারে। পুরোনো চুল পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন চুল গজাতে থাকায় সাধারণত এটি চোখে পড়ে না। তবে হঠাৎ করে চিরুনি বা বালিশে আগের তুলনায় অনেক বেশি চুল পাওয়া গেলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার। বিশেষ করে মাথার কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় চুল পাতলা হয়ে গেলে, গোলাকার ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে বা কয়েক সপ্তাহ ধরে চুল পড়া বাড়তেই থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চুল ভালো রাখতে কী করবেন?
চুলের যত্নে খুব জটিল নিয়মের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি সাধারণ অভ্যাসই অনেক ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
চুল খুব শক্ত করে বাঁধবেন না
অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার কমান
ভেজা চুলে জোরে চিরুনি চালাবেন না
তোয়ালে দিয়ে চুল ঘষে শুকাবেন না
প্রয়োজন অনুযায়ী চুল ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন
প্রতিবার চুল ধোয়ার পর চুলের ধরন অনুযায়ী কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন
বারবার রাসায়নিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলুন
পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার খান
অতিরিক্ত কম ক্যালরির খাদ্যাভ্যাস এড়িয়ে চলুন
মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন
ধূমপান এড়িয়ে চলুন
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চুল পড়া যদি হঠাৎ বেড়ে যায় বা দ্রুত মাথার কোনো অংশ ফাঁকা হতে শুরু করে, তাহলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ চুল পড়ার ধরন দেখে এর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি হতে পারে। বিশেষ করে চুল পড়ার সঙ্গে মাথার ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব, ব্যথা, ক্ষত বা গোলাকার ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রতিদিন কয়েকটি চুল পড়ে যাওয়া মানেই কোনো সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে চুলের ওপর টান, অতিরিক্ত তাপ, রাসায়নিক ব্যবহার, অযত্ন বা পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চুলের ক্ষতি বাড়তে পারে। তাই চুল পড়া বন্ধ করার জন্য শুধু দামি প্রসাধনী খোঁজার বদলে প্রতিদিনের অভ্যাসগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। চুলের সঙ্গে একটু কোমল আচরণ, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ, এই তিনটিই চুলের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সামা নিউজ
এসএএস