বড়দের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও ঘুমের সমস্যা বাড়ছে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পরিবারের জন্য ঘুমের সময়টি দিনের সবচেয়ে কঠিন অংশ হয়ে উঠেছে। যে শিশু আগে সহজেই ঘুমিয়ে পড়ত, সে এখন আরও পাঁচ মিনিট জেগে থাকার আবদার করছে, রাতে বারবার জেগে উঠছে কিংবা সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হচ্ছে।
অনেক সময় এসব সমস্যার জন্য শুধু মোবাইল ফোন বা অন্য পর্দার ব্যবহারকে দায়ী করা হয়। তবে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনীশ মান্নানের মতে, সন্ধ্যার রুটিনে যুক্ত হয়ে যাওয়া ছোট ছোট কিছু অভ্যাসও শিশুদের ঘুমের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের জন্য ঘুম কেন জরুরি?
ঘুম শিশুদের স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের সুপারিশ অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুদের প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা এবং কিশোর-কিশোরীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুদের মনোযোগ, আচরণ, মেজাজ ও দিনের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ঘুমের সময় নিয়ে বাবা-মায়ের ভুল
চিকিৎসকদের মতে, বাবা-মায়ের একটি সাধারণ ভুল হলো ঘুমের সময়কে আলোচনাযোগ্য করে তোলা। কখনো হোমওয়ার্ক শেষ হতে দেরি হয়, কখনো রাতের খাবার দেরিতে দেওয়া হয়। আবার টেলিভিশন, মোবাইল বা অন্য ডিভাইস ব্যবহারের সময়ও রাত পর্যন্ত বাড়তে থাকে।
সপ্তাহের কর্মদিবসে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমালেও ছুটির দিনে শিশুদের অনেক দেরি করে ঘুমাতে দেওয়া হয়। এতে শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ি বা ঘুমের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে এবং সপ্তাহের শুরুতে আগের রুটিনে ফিরতে সমস্যা হয়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিন ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার সময় যতটা সম্ভব একই রাখা উচিত। গোসল, দাঁত ব্রাশ, বই পড়া কিংবা কিছুক্ষণ শান্ত থাকার মতো কাজগুলো ঘুমানোর আগের রুটিনের অংশ হওয়া উচিত।

যে ৫টি অভ্যাস বদলানো দরকার
১. ঘুমানোর আগ পর্যন্ত স্ক্রিন টাইমের ব্যবহার
মোবাইল, ট্যাবলেট, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, যখন তখন মস্তিষ্কের ধীরে ধীরে শান্ত হওয়ার কথা। তাই ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে স্ক্রিন বন্ধ করা উচিত। সম্ভব হলে মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইস শোবার ঘরের বাইরে রাখা ভালো।
২. ছুটির দিনে ঘুমের সময় অনেকটা বদলে দেওয়া
স্কুলের দিন রাত ১০টায় ঘুমানো এবং ছুটির দিনে মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকা শিশুর শরীরের ঘড়িতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ছুটিরে দিনেও ঘুম ও জাগার সময় কর্মদিবসের সময়ের কাছাকাছি রাখা উচিত।
৩. বিছানায় সব ধরনের কাজ করা
বিছানায় পড়াশোনা, গেম খেলা, ভিডিও দেখা বা মোবাইল চালানোর অভ্যাস ঘুমের সঙ্গে বিছানার স্বাভাবিক সম্পর্ক দুর্বল করে। ঘুমের জন্য শান্ত, মৃদু আলোযুক্ত এবং কম-বিক্ষিপ্ত পরিবেশ তৈরি করা ভালো।
৪. শিশুকে অতিরিক্ত ক্লান্ত করে তোলার চেষ্টা
টিউশন, হোমওয়ার্ক, খেলাধুলা ও স্ক্রিনে ভরা ব্যস্ত সন্ধ্যা মানেই ভালো ঘুম নয়। ঘুমানোর আগে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ককে সক্রিয়তা থেকে বিশ্রামে যাওয়ার সময় দিতে হবে। বই পড়া, শান্তভাবে কথা বলা বা পরিচিত কোনো শান্ত রুটিন এতে সহায়ক হতে পারে।

৫. রাতে খাবার ও ক্যাফেইনের বিষয়টি উপেক্ষা করা
কোলা জাতীয় পানীয়, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং গাঢ় চা বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ঘুমে বাধা দিতে পারে। তাই রাতের খাবার ও হালকা নাশতার সময়ও শিশুর ঘুমের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সব ধরনের ঘুমের সমস্যা শুধু আচরণগত কারণে হয় না। কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে। শিশুর নিয়মিত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, বারবার জেগে ওঠা, অস্থির ঘুম, সকালে মাথাব্যথা বা দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর ভালো ঘুম নিশ্চিত করার প্রস্তুতি বিছানায় যাওয়ার আগেই শুরু হয়। এজন্য খুব কঠোর সময়সূচি প্রয়োজন নেই; বরং একটি নিয়মিত ও অনুমানযোগ্য রুটিন তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ধ্যার হৈ-হুল্লোড় কমানো, স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুললে প্রতিদিনের ঘুমের সময় নিয়ে টানাপোড়েন কমিয়ে শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর রুটিন তৈরি করা সম্ভব।
এসএএস