wcm
Back to home

রোগীর সেবায় নবীজি (সা.) এর আত্মনিয়োগ

রোগীর সেবা শুধু ওষুধপথ্য বা চিকিৎসাকেন্দ্রের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর মনের চাওয়া ও প্রয়োজন বুঝে তার পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোই প্রকৃত সেবার মূল মর্ম।

ডেস্ক রিপোর্ট

August 27, 2026

রোগীর সেবায় নবীজি (সা.) এর আত্মনিয়োগ
ফাইল ছবি

অসুস্থতা মানুষের জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা ও কঠিন পরীক্ষা। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি এ সময় প্রিয়জনদের সান্নিধ্য, মানসিক সাহস ও সান্ত্বনা রোগীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) অসুস্থতার এই কষ্ট ও মানসিক অবস্থা গভীরভাবে অনুধাবন করতেন। সাহাবি বা পরিচিতদের কেউ অসুস্থ হলে তিনি নিজে ছুটে যেতেন, শয্যাপাশে বসে সাহস জোগাতেন এবং সুস্থতার দোয়া করতেন। অসুস্থতার এই কষ্টকে তিনি মুমিনের জন্য মর্যাদাবৃদ্ধি ও গুনাহ মোচনের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে শিখিয়ে গেছেন।

১. নিজে গিয়ে অসুস্থের খোঁজ নেওয়া ও পাশে থাকা

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া নবীজি (স.)-এর অন্যতম সুন্নাহ। তিনি নিজে অসুস্থ মানুষের কাছে যেতেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতেন।হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) এক অসুস্থ বেদুইনকে দেখতে গেলেন। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—

لا بَأْسَ، طَهُورٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: ‘লা বা’ছা ত্বহুরুন ইনশাআল্লাহ।’

অর্থ: ‘কোনো অসুবিধা নেই, ইনশাআল্লাহ এটি পবিত্রকারী।’ (বুখারি ৫৬৫৬)

অসুস্থ মানুষের কাছে গিয়ে তার অবস্থা জানতে চাওয়া এবং পাশে সময় কাটানো তার মনোবল বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। নবীজি (স.)-এর আচরণে অসুস্থ মানুষের প্রতি এই আন্তরিকতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে।

ফ্যাটি লিভারের যম টমেটো
আরও পড়ুন ফ্যাটি লিভারের যম টমেটো

২. রোগীর বস্তুগত ও মানসিক প্রয়োজনের যত্ন নেওয়া

অসুস্থ ব্যক্তির শুধু রোগের রুটিন খোঁজ নেওয়াই নয়, তার ব্যক্তিগত ও শারীরিক প্রয়োজনের প্রতিও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন নবীজি (স.)। রোগী বা ভুক্তভোগী মানুষটি এই মুহূর্তে কিছু খেতে চাইছে কি না, তার বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে কি না—এসব বিষয় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। ইসলামের শিক্ষা হলো—রোগীর সেবা শুধু ওষুধপথ্য বা চিকিৎসাকেন্দ্রের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর মনের চাওয়া ও প্রয়োজন বুঝে তার পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোই প্রকৃত সেবার মূল মর্ম।

৩. রোগীর দ্রুত আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করা

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি রোগীর পূর্ণ সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতেন নবীজি (স.)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) তার পরিবারের কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তার শরীরে ডান হাত বুলিয়ে এই দোয়াটি পাঠ করতেন—

أَذْهِبِ الْبَاسَ رَبَّ النَّاسِ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

উচ্চারণ: ‘আযহিবিল বা’স রাব্বান নাস, ওয়াশফি আন্তাশ শাফি, লা শিফা ইল্লা শিফাউকা, শিফাউ আল্লা ইউগাদির সাকমা।’

অর্থ: ‘হে মানুষের রব! কষ্ট দূর করে দিন, শিফা দান করুন। আপনিই শিফাদাতা। আপনার শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই। এমন শিফা দিন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।’ (বুখারি ৫৭৫০)

চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি প্রকৃত শিফার মালিক যে মহান আল্লাহ, এই সুদৃঢ় বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে ধারণ করা অপরিহার্য।

পেট ফাঁপা-ওজন কমাতে নিয়মিত যেই চা পান করবেন
আরও পড়ুন পেট ফাঁপা-ওজন কমাতে নিয়মিত যেই চা পান করবেন

৪. রোগীকে সাহস, সান্ত্বনা ও আশার বাণী শোনানো

অসুস্থতার ক্লান্তিকর সময়ে মানুষ খুব দ্রুত হতাশ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন স্পর্শকাতর মুহূর্তে মানুষের মনে ভয় বা আশঙ্কা না বাড়িয়ে বরং অফুরন্ত আশার আলো জ্বেলে দিতেন। বেদুইন রোগীকে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন— ‘কোনো অসুবিধা নেই, ইনশাআল্লাহ এটি পবিত্রকারী।’ (বুখারি ৫৬৫৬)

অন্য একটি বর্ণনায় অসুস্থ ব্যক্তির সামনে সবসময় আনন্দদায়ক, প্রফুল্ল ও আশাব্যঞ্জক কথা বলতে বিশেষ উৎসাহিত করা হয়েছে। (তিরমিজি ২০৯৪)

রোগীর সামনে কখনোই এমন কোনো নেতিবাচক কথা বলা উচিত নয়, যা তার ভীতি বা হতাশা বাড়িয়ে দিতে পারে।

৫. অসুস্থতার কষ্ট মুমিনের গুনাহ মোচনের অছিলা

অসুস্থতা মুমিনের জন্য কেবল কষ্টই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমার ঘোষণা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখেন তার প্রচণ্ড জ্বর। তিনি তখন আরজ করলেন, এত তীব্র জ্বরের কারণে কি আপনার দ্বিগুণ সওয়াব হবে? নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। এরপর তিনি ইরশাদ করেন— কোনো মুসলমানের ওপর অসুস্থতা বা অন্য কোনো কষ্ট এলে আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানিতে তার মাধ্যমে তার গুনাহগুলো এমনভাবে ঝরে যায়, যেমন গাছ তার শুকনো পাতা ঝরিয়ে দেয়। (বুখারি ৫৬৪৭)

ধৈর্যের সঙ্গে অসুস্থতার কষ্ট সহ্য করলে তা মানুষের পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যে কারণে বড় কোমরের মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি
আরও পড়ুন যে কারণে বড় কোমরের মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি

৬. রোগী দেখতে যাওয়ার অপরিসীম ফজিলত ও সওয়াব

ইসলামে অসুস্থ ভাইয়ের খোঁজ নেওয়া বা দেখতে যাওয়ার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এর রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার। তাহলো—

জান্নাতের ফল আহরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলমান তার অসুস্থ ভাইকে দেখতে যায়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে।’ (মুসলিম ২৫৬৮)

ফেরেশতাদের দোয়া: অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘সকালে কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে গেলে সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যায় দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার মাগফিরাত ও সুস্থতার জন্য দোয়া করতে থাকে।’ (তিরমিজি ৯৬৯)

আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা সাধারণ পরিচিত কারও খোঁজ নেওয়া নিছক সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ইবাদত।

৭. রোগীকে দেখতে গিয়ে পাঠ করার সুন্নাহভিত্তিক বিশেষ দোয়া

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) যখনই কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন, তখন তার শয্যাপাশে বসে এই বিশেষ দোয়াটি সাতবার আবৃত্তি করতেন—

أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ، رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، أَنْ يَشْفِيَكَ

উচ্চারণ: ‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আন ইয়াশফিয়াক।’

অর্থ: ‘আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, যিনি মহান আরশের প্রতিপালক। তিনি যেন আপনাকে সুস্থ করে দেন।’ (তিরমিজি: ২০৮৩)

অসুস্থ স্বজন বা পরিচিতদের দেখতে গিয়ে এই সুন্নাহভিত্তিক দোয়াটি পাঠ করা গভীর মমতা প্রকাশের পাশাপাশি নবীজির আদর্শ অনুসরণের চমৎকার মাধ্যম।

কতো মাস বয়সে শিশুকে ডিম দেওয়া নিরাপদ?
আরও পড়ুন কতো মাস বয়সে শিশুকে ডিম দেওয়া নিরাপদ?

৮. সর্বজনীন মানবিকতা ও মানবতার অনুপম শিক্ষা

অসুস্থ মানুষের প্রতি নবীজি (স.)-এর দয়া ও মমতা কেবল মুসলিমদের মাঝেই সীমিত ছিল না, তা ছিল বিশ্ববাসীর জন্য। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘এক ইহুদি কিশোর নিয়মিত নবীজি (স.)-এর সেবা করত। একসময় সেই কিশোর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে তাকে দেখতে তার বাড়িতে যান এবং তার শিয়রে উপস্থিত হন। পরে তাকে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি আহ্বান জানালে সে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয় ‘ (বুখারি ১৩৫৬)

এই অনুপম ঘটনা প্রমাণ করে যে, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবতার সেবা করা ইসলামের সর্বজনীন শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অসুস্থ মানুষের প্রয়োজন কেবল শারীরিক চিকিৎসা বা ওষুধপথ্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অনেক সময় তার সর্বাপেক্ষা বেশি প্রয়োজন হয় একজন আপন মানুষের—যে তার ব্যথিত শিয়রে এসে বসবে, সান্ত্বনার বাণী শোনাবে, পরম যত্নে দোয়া করবে এবং তাকে নতুন আশার আলো দেখাবে। তাই আমাদের চারপাশের পরিচিত বা অপরিচিত কেউ অসুস্থ হলে তার পাশে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া, মমতা ও প্রার্থনার মাধ্যমে সাহস জোগানোই হোক আমাদের জীবনে নববী মমতার এক নিখাদ ও বাস্তব প্রকাশ।

 

Share
wcm

আরও জানুন

কতো মাস বয়সে শিশুকে ডিম দেওয়া নিরাপদ?
স্বাস্থ্য

কতো মাস বয়সে শিশুকে ডিম দেওয়া নিরাপদ?

শিশুর বয়স প্রায় ৬ মাস হলে এবং সে বাড়তি খাবারের জন্য প্রস্তুত থাকলে ডিম দেওয়া শুরু করা যেতে পারে। ডিম দেওয়ার জন্য ৮ বা ৯ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

ডেস্ক রিপোর্ট 25 Aug
রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙার কারণ ও প্রতিকার
স্বাস্থ্য

রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙার কারণ ও প্রতিকার

নিয়মিত একাধিকবার ঘুম ভেঙে গেলে এবং এতে ঘুম বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা কিংবা জ্বরের মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 25 Aug
চুল পড়ার সমস্যায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সতর্ক হোন
স্বাস্থ্য

চুল পড়ার সমস্যায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সতর্ক হোন

কোনো একটি খাবার খেলেই চুল পড়া শুরু হয়ে যায়, এমন সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ নেই। চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, কিছু শারীরিক সমস্যা, মানসিক চাপসহ নানা কারণ থাকতে পারে। খাবার এসব সমস্যার কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 25 Aug
কোন ধরনের চপিং বোর্ড বেশি নিরাপদ?
স্বাস্থ্য

কোন ধরনের চপিং বোর্ড বেশি নিরাপদ?

কোনটা নিরাপদ সেটা আসলে সব নয় বরং আপনি কী কাটছেন এবং বোর্ডটি কীভাবে পরিষ্কার রাখছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা মাংস ও মাছের জন্য আলাদা বোর্ড ব্যবহার করা ভালো। সবজি বা ফল কাটার জন্য অন্য একটি বোর্ড রাখতে পারেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 24 Aug