




বাংলাদেশে অপটোমেট্রির স্বতন্ত্র স্বীকৃতি, সরকারি অন্তর্ভুক্তি ও স্বাধীন কাউন্সিলের দাবি
বাংলাদেশে রিফ্র্যাকটিভ ত্রুটি, শিশুদের দৃষ্টিজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিসজনিত চক্ষু জটিলতা, স্বল্পদৃষ্টি এবং প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত, নিরাপদ ও সহজলভ্য চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ চক্ষুস্বাস্থ্য জনবল গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান মানবসম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে দেশের সামগ্রিক চক্ষুসেবাকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে অপটোমেট্রি পেশার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাউন্সিল গঠনের দাবি জোরদার হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতে, অপটোমেট্রি আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত স্বাস্থ্যবিজ্ঞানভিত্তিক চক্ষুস্বাস্থ্য পেশা। বিশ্বের বহু দেশে অপটোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চক্ষুসেবা প্রদানকারী হিসেবে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করছেন। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অপটোমেট্রিস্টরা মেডিকেল ডাক্তার (এমবিবিএস) নন এবং তারা চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা অফথালমোলজিস্টদের বিকল্পও নন। বরং তারা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সহযোগী ও পরিপূরক অংশীদার হিসেবে কাজ করেন, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। তাদের মূল কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, চশমার পাওয়ার নির্ধারণ, দুই চোখের সমন্বিত দৃষ্টি মূল্যায়ন, শিশু চক্ষুসেবা, কনট্যাক্ট লেন্স সেবা, স্বল্পদৃষ্টি পুনর্বাসন, দৃষ্টি থেরাপি ও কমিউনিটি চক্ষুসেবা। তারা কোনো ধরনের অপারেশন বা জটিল চোখের রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা পরিচালনা করেন না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে যথাযথ চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে এই সমন্বিত মডেলটি দীর্ঘ সময় ধরে সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে বাংলাদেশেও অপটোমেট্রি শিক্ষার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত একাডেমিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজিতে চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপটোমেট্রি (বি.অপ্টম) শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া দেশে ডক্টর অব অপটোমেট্রি (ওডি), স্নাতকোত্তর, এমফিল, এমএসসি এবং পিএইচডি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীরাও রয়েছেন, যারা ক্লিনিক্যাল চক্ষুসেবা, গবেষণা, শিক্ষকতা ও একাডেমিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এমনকি বাংলাদেশের বহু অপটোমেট্রিস্ট বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিবন্ধিত পেশাজীবী হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিচ্ছেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি অপটোমেট্রিস্টদের দক্ষতারই প্রতিফলন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব প্রতিরোধ সংস্থা (IAPB)-এর মতো বৈশ্বিক সংগঠনগুলোও এই জনবলকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলাদেশে এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক অপটোমেট্রিকে স্বতন্ত্র চক্ষুস্বাস্থ্য পেশা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অপটোমেট্রিস্টদের জন্য জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা, লাইসেন্সিং কাঠামো, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ইতোমধ্যে যে দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত অপটোমেট্রি জনবল তৈরি হয়েছে, তাদের সরকারি কাঠামোতে যুক্ত করা গেলে স্কুলভিত্তিক দৃষ্টি পরীক্ষণ, গ্রামীণ ও কমিউনিটি চক্ষুসেবার বিস্তারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বাংলাদেশি অপটোমেট্রিস্ট এবং বিশ্ব অপটোমেট্রি কাউন্সিল (WCO)-এর সদস্য শাহাদাত হোসেন দেলোয়ার বলেন, "অপটোমেট্রিস্টরা মেডিকেল ডাক্তার নন এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞদের বিকল্পও নন; বরং তারা সমন্বিত চক্ষুসেবা ব্যবস্থায় পরিপূরক হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অপটোমেট্রিকে স্বতন্ত্র পেশার স্বীকৃতি দেওয়া, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পদ সৃষ্টি এবং একটি স্বাধীন বাংলাদেশ অপটোমেট্রি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।" তিনি আরও যোগ করেন, "এই দক্ষ জনবলকে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা হলে প্রাথমিক চক্ষুসেবা আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।"
চক্ষুস্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের জোরালো দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবিলম্বে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ভিশন সেন্টারগুলোতে "অপটোমেট্রিস্ট" পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ নিশ্চিত করুক। পাশাপাশি অপটোমেট্রি শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান ও পেশাগত নৈতিকতা তদারকির জন্য একটি স্বাধীন 'বাংলাদেশ অপটোমেট্রি কাউন্সিল' গঠন করা হোক। এই জনবলকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হলে তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন