যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসকদের গড় বার্ষিক আয় বেড়ে তিন লাখ ৮৬ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছর এ আয় ছিল তিন লাখ ৭৪ হাজার ডলার এবং দুই বছর আগে ছিল তিন লাখ ৬৩ হাজার ডলার। তবে আয় বাড়লেও আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার অনুভূতি কাটছে না চিকিৎসকদের।
শিক্ষাকালীন ঋণের বোঝা, দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ, অন্যদের তুলনায় দেরিতে উপার্জন শুরু করা এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তাদের আর্থিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মেডস্কেপের ‘মিলেনিয়াল ফিজিশিয়ান কমপেনসেশন রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের ধারণা, স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা তাদের কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। প্রায় ৩০ শতাংশ চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাদের আয় দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আর প্রতি ১০ জনে চারজন বলেছেন, সংসারের খরচ সামলাতে তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে।

চিকিৎসক ও আর্থিক সেবাপ্রতিষ্ঠান প্যানাসিয়া ফাইন্যান্সিয়ালের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল জার্কিনস বলেন, চিকিৎসা পেশা এখনো আকর্ষণীয়। তবে মিলেনিয়াল প্রজন্মের চিকিৎসকদের কাজ করতে হচ্ছে এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, যা আগের প্রজন্মের চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটাই আলাদা।
মেডস্কেপের ২০২৬ সালের চিকিৎসক পারিশ্রমিকবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসকদের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে বিশেষায়িত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির চিত্র এক নয়।
প্যানাসিয়ার বিশ্লেষণে আমেরিকান মেডিকেল গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য ব্যবহার করে দেখা গেছে, ১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর শিশু বিশেষজ্ঞদের প্রকৃত আয় ৩ শতাংশ এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের আয় ৮ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, অ্যানেসথেসিওলজির মতো উচ্চ আয়ের বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রকৃত আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ।

জার্কিনসের মতে, চিকিৎসকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। তার ভাষ্য, মেডিকেয়ারের আওতায় চিকিৎসাসেবার জন্য সরকারের দেওয়া অর্থ মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিশেষ করে অস্ত্রোপচারনির্ভর নয়—এমন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় আয় করার সুযোগ কমেছে।
শিক্ষাঋণের বড় বোঝা
মিলেনিয়াল প্রজন্মের চিকিৎসকদের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ শিক্ষাঋণ। চিকিৎসাশিক্ষার ব্যয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর স্নাতক হওয়ার সময় শুধু মেডিকেল স্কুলের জন্য গড়ে ২ লাখ ১৬ হাজার ডলার ঋণ থাকে। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাঋণ যোগ করলে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ডলার।
২০২৬ সালে প্যানাসিয়া ফাইন্যান্সিয়ালের পরিচালিত এক জরিপে চিকিৎসক, দন্তচিকিৎসক ও পশুচিকিৎসকদের আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ চিকিৎসকের প্রধান আর্থিক অগ্রাধিকার শিক্ষাঋণ পরিশোধ। বিনিয়োগ, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো কিংবা অবসরজীবনের জন্য সঞ্চয়ের চেয়েও ঋণ পরিশোধকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রায় ৭০ শতাংশ বলেছেন, ঋণের বোঝা সামলে অন্য আর্থিক লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, ফেডারেল শিক্ষাঋণের সীমা ২ লাখ ডলারে নির্ধারিত হওয়ার পর বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা নতুন করে চিকিৎসা পেশায় আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ভাবতেন।
শিশু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক শিক্ষাবিষয়ক লেখক জশ ডেইলি বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষাঋণ নিয়ে প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আসে। ঋণের চাপ এতটাই স্পষ্ট যে অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত ঋণমুক্ত হওয়ার দিকে মনোযোগ দেন। এতে বিনিয়োগের মতো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কৌশল তাদের মনোযোগের বাইরে থেকে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালোপ্যাথিক মেডিকেল স্কুল থেকে স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই মেডিকেল শিক্ষার জন্য ঋণ রয়েছে। এই ঋণ তাদের আর্থিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ঋণ পরিশোধের সুবিধা কোথায় কাজ করবেন, কোন বিশেষায়িত শাখায় যাবেন কিংবা কোথায় বসবাস করবেন—সেসব সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। জার্কিনসের মতে, চিকিৎসকদের শিক্ষাঋণ শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ধরনকেও প্রভাবিত করে।
উপার্জন শুরু হতে দেরি
আগের প্রজন্মের তুলনায় মিলেনিয়াল প্রজন্মের চিকিৎসকদের উচ্চ আয় শুরু করতেও বেশি সময় লাগছে। রেসিডেন্সি শুরুর আগে এক বা দুই বছর বিরতি নেওয়া এবং আরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ বা ফেলোশিপ করার প্রবণতা তাদের মধ্যে বেশি। ফলে স্বাধীনভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বা অ্যাটেন্ডিং পর্যায়ের বেতন পেতে পেতে অনেকের বয়স ত্রিশের মাঝামাঝি হয়ে যায়।
এর প্রভাব পড়ে সম্পদ গড়ে তোলার ওপর। জীবনের বিশের দশকে আয় ও বিনিয়োগের যে সুযোগ থাকে, চিকিৎসাশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দীর্ঘ সময়ের কারণে তা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। ফলে নিয়মিত উচ্চ আয় শুরু হওয়ার পরও ঋণ পরিশোধ, বাড়ি কেনা, পরিবার পরিচালনা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

ডেইলি বলেন, ৩৫ বছর বয়সে কোনো চিকিৎসকের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ডলার হলেও তার নিট সম্পদের পরিমাণ ঋণাত্মক থাকতে পারে। এ অবস্থায় উচ্চ আয়ের মানুষের সঙ্গে সাধারণত যুক্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন—যেমন দামি গাড়ি, বাড়ি কিংবা নিয়মিত ছুটি কাটানো—সহজ হয় না। বরং আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হয়।
চিকিৎসকেরা দেরিতে উচ্চ আয় শুরু করায় বিনিয়োগের জন্যও সময় কম পান। প্রশিক্ষণকালেই বাড়ি কেনা, সন্তান লালন-পালন কিংবা ঋণ পরিশোধের মতো সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। ফলে প্রথম বড় বেতন হাতে পাওয়ার পর সেই অর্থ ব্যবহারের জন্য একাধিক প্রতিযোগী প্রয়োজন সামনে আসে। কাগজে-কলমে আয় বেশি হলেও বাস্তবে তা দিয়ে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত মালিকানা কম
চিকিৎসকদের সম্পদ গড়ে তোলার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগের প্রজন্মের অনেক চিকিৎসক ব্যক্তিগত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেন বা তাতে বিনিয়োগ করতেন। পরে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে তারা বড় অঙ্কের অর্থ পেতেন। কিন্তু বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বেড়েছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮২ শতাংশ চিকিৎসক কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। তাদের বিনিয়োগের বড় ভরসা প্রচলিত অবসরকালীন সঞ্চয় হিসাব। চাকরির সুবিধা হলো, চিকিৎসকেরা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বা ব্যবসা সামলানোর পরিবর্তে রোগীর চিকিৎসায় বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। তবে ব্যক্তিগত মালিকানা ও স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ কমে যাওয়ায় সম্পদ বৃদ্ধির বিকল্প পথও সীমিত হচ্ছে বলে মনে করেন জার্কিনস।

সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর করা একটি বৃহত্তর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ত্রিশের দশকের শেষ দিকে মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষের নিট সম্পদ একই বয়সে ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের সম্পদের তুলনায় বেশি। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাড়ির দাম ও শেয়ারবাজারের মূল্যবৃদ্ধি এতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে জার্কিনসের মতে, এই ফলাফল সরাসরি মিলেনিয়াল প্রজন্মের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। তাদের কেউ কেউ বাড়ি ও শেয়ারবাজারের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সুবিধা পেলেও দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, দেরিতে বিনিয়োগ শুরু করা এবং শিক্ষাঋণের চাপ সেই সুবিধা অনেকটাই সীমিত করেছে।
আগের প্রজন্মও কি বেশি ভালো ছিল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি ঋণ, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং দেরিতে আয় শুরু করার কারণে মিলেনিয়াল প্রজন্মের চিকিৎসকদের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পিছিয়ে থাকার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তবে ডেইলি মনে করেন, আগের প্রজন্মের চিকিৎসকেরা যে সব দিক থেকে ভালো অবস্থানে ছিলেন, এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়।

তার মতে, মানুষ অতীতকে অনেক সময় বাস্তবের তুলনায় বেশি সুখকর মনে করে। স্মৃতির এই প্রবণতা এবং এক প্রজন্মের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের তুলনা অতীতকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। বর্তমান চিকিৎসকদের চ্যালেঞ্জগুলো তাঁদের শিক্ষক ও পরামর্শদাতাদের অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা হওয়ায়, আগের প্রজন্মের পক্ষে এসব সমস্যার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।
তবে সামগ্রিক হিসাবে চিকিৎসকদের আয় এখনো আগের প্রজন্মের তুলনায় খুব খারাপ নয় বলে মনে করেন ডেইলি। তার ভাষায়, ৫০ বছর আগেও চিকিৎসকেরা ভালো আয় করতেন, এখনো করেন।
আর্থিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও মানুষ চিকিৎসা পেশায় আসছেন এবং রোগীদের সুস্থ করে তুলতে কাজ করছেন—এ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জার্কিনস। তাঁর মতে, আর্থিক বাস্তবতা কঠিন হলেও মানুষের সেবা করার আগ্রহ এখনো এই পেশার অন্যতম শক্তি।