ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে ৩৬ লাখ রুপি বিলের জন্য আট দিন স্বামীর লাশ আটকে রাখার অভিযোগ করেছেন এক বাংলাদেশি নারী। তিনি আরও জানান, বিলের জন্য তার পাসপোর্টও রেখে দিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অবশেষে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা চাওয়ার পর বহু ‘নাটকীয়তা’ শেষে গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) স্বামীর লাশ বুঝে পান ভুক্তভোগী নারী।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, মিথ্যা আশা দেখিয়ে প্রথমে তার স্বামীর ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। তারপর রোগীর ডান পা কেটে ফেলা হয়। পরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়।
তার অভিযোগ, চিকিৎসা শুরুর আগে তাকে খরচের কোনো লিখিত হিসাব দেওয়া হয়নি। চিকিৎসা চলাকালীন হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী কয়েক দফায় মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করেন তিনি। কিন্তু বিল পরিশোধের কোনো রসিদ তাকে দেওয়া হয়নি। এছাড়া, চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কেও আগে তাকে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। অথচ, তার স্বামীর মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার রুপি বিল পরিশোধ না করলে লাশ দেওয়া হবে না বলে জানায়।

এ ঘটনা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জানানো হয়, নওগাঁর বাসিন্দা তানজিলা ইসলাম আশা (২৬) তার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল হাকিম শাবুজের (৩২) কিডনির চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরু যান। পরদিন বুকে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শাবুজকে ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের মণিপাল হাসপাতালে (Manipal Hospital) ভর্তি করা হয়।
তানজিলার দাবি, পরবর্তী কয়েক দিন শাবুজের একাধিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর, ১৪ সেপ্টেম্বর তার ডান পায়ে সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় সেটি কেটে ফেলতে হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে শাবুজ মারা যান।

তানজিলা আরও জানান, চিকিৎসা চলাকালীন হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী কয়েক দফায় মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করেন তিনি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর লাশ বাংলাদেশে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার রুপি পরিশোধের দাবি করে। টাকা না দিলে লাশ দেওয়া হবে না বলে তাকে জানায় কর্তৃপক্ষ।
তিনি অভিযোগ করেন, পরিশোধ করা ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপির কোনো রসিদ তাকে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কেও আগে তাকে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। কিন্তু তার স্বামীর মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আট দিন লাশ আটকে রাখার পাশাপাশি তানজিলার পাসপোর্টও রেখে দিয়েছিল বলে জানান তিনি।

পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা চান তানজিলা। অবশেষে আট দিন পর গত শনিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া বিল শূন্য দেখিয়ে লাশ হস্তান্তর করে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে আরও বলা হয়, মনিপুর হাসপাতালের এক কর্মকর্তা লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
পরে এক বিবৃতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শাবুজ গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কম ছিল এবং তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে তাকে ইসিএমও ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, পরীক্ষায় রোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট ও রক্তনালিতে বাধা ধরা পড়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর তার পালমোনারি থ্রম্বো এন্ডার্টেরেকটমি অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহত শাবুজের বন্ধু পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ইরফান মোস্তাকিম বেঙ্গালুরু গিয়ে হাসপাতাল থেকে লাশ হস্তান্তরে সহায়তা করেন। দ্য লাইফ কেয়ার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মোস্তাকিম জানান, স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় শুক্রবার তানজিলার পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। লাশ দেশে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেও তারা সহযোগিতা করেন।
এদিকে ফেসবুকে এক পোস্টে মোস্তাকিম জানান, তিনি এ বিষয়টি জানার পর বিভিন্ন মিডিয়া, কর্ণাটক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বেঙ্গালুরু পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে সহায়তা চান।

তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনা নিয়ে মুখ না খুলতে ভুক্তভোগী নারীকে একটি লেটারে সাইন করতে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মোস্তাকিম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, এখন বলছে এই লেটারে সাইন করে সবকিছু ক্লোজ করতে। আমরা বলেছি- লাশ নেব না, তাও ভালো। কিন্তু এই চিঠিতে সই করা হবে না। এটাতে সই করলে এটার ছবি মিডিয়াতে দিয়ে পেশেন্ট পার্টির বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ তৈরি করবে। এমনকি হাসপাতালের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে এজন্য টাকাও অফার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পৃথক এক পোস্টে তিনি জানান, শনিবার প্রায় দুই ঘন্টা ধরে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে জীবন বীমা নগর পুলিশ স্টেশন থেকে এনওসি (NOC) পাওয়া যায়।
পুলিশের এক কর্মকর্তার বরাতে মোস্তাকিম জানান, ভারতের হাসপাতালগুলো এরকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গত পাঁচ বছরে প্রচুর বেড়ে গেছে।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, তিনি কি সাংঘাতিক দালালচক্র চলছে! বাংলাদেশীদের কেউ মানুষ তো দূর, পোকামাকড় বলেও মনে করে না। আর টাকা? মৃতদেহ থেকেও কিভাবে টাকা ইনকাম করা যায়, এদের দেখে শিখতে হয়। ধার্মিকতা তো দূর! সামান্য মনুষ্যত্বেরও ছোঁয়া নেই।
পৃথক আরেক পোস্টে বাংলাদেশি রোগীদের দালালের খপ্পরে না পড়ার আহ্বান জানিয়ে ভারতের এই নাগরিক বলেন, ‘কি অবর্ণনীয় চিটিংবাজি হচ্ছে চিকিৎসা নিয়ে, তা সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরে! বাংলাদেশী ভাই-বোনেদের কাছে অনুরোধ, ভারতে ট্রিটমেন্ট করাতে এলে দয়া করে কোন দালালের খপ্পরে পড়বেন না।’