ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা জোসনা বেগম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে অবস্থা যখন গুরুতর, তখন চিকিৎসকরা তার লিভার প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সপ্লান্ট) পরামর্শ দেন। জোসনা বেগমের লিভারের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে তাকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা ভাবেন পরিবারের সদস্যরা। তারা জানতেন, লিভার প্রতিস্থাপনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
কিন্তু ভারতের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জানতে পারেন, শুধু লিভার প্রতিস্থাপনেই খরচ হবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বিপুল এই ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। চিকিৎসার পেছনে এরই মধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের পক্ষে এত বড় ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই মিলল সমাধান।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের পরামর্শে জোসনা বেগমের পরিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে যোগাযোগ করে। সেখানেই গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সফলভাবে জোসনার লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।
নিজের মাকে নতুন জীবন দিতে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করেন তার ছেলে মো. সাজ্জাদ। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী।
২০২২ সাল থেকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন জোসনা বেগম। সেখানে কয়েকবার ভর্তি হন তিনি। লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ পাওয়ার পর পরিবারটি ভারতের কথা ভাবলেও সম্ভাব্য ৫০ লাখ টাকার ব্যয় তাদের পিছিয়ে দেয়। পরে মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে জোসনা বিএমইউতে যান। লিভার প্রতিস্থাপনের প্রায় তিন মাস আগে সেখানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। তিন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর অস্ত্রোপচার করা হয়। বিএমইউতে নতুন চালু হওয়া সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রথম রোগী হিসেবে জোসনা বেগমের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। আর জোসনা বেগম ফিরে পান স্বাভাবিক জীবন।

জোসনা বেগম প্রায় এক মাস হাসপাতালে ছিলেন। তার ছেলে সাদ্দাদকে থাকতে হয়েছে প্রায় ১৫ দিন। অস্ত্রোপচারের পর জোসনা ভালোভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি অঙ্গপ্রত্যাখ্যান (অর্গান রিজেকশন) ঠেকাতে নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন।
সরকারি অর্থায়নে জোসনা বেগমের লিভার প্রতিস্থাপন বিনামূল্যে করা হয়েছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও পরবর্তী চিকিৎসায় পরিবারের প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়ে জোসনা বেগম বলেন, এখন আমি স্বাভাবিক সব কাজ করতে পারি। আসলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই আমি এসব কাজ করতে পারছিলাম।
তার ছেলে সাজ্জাদ বলেন, আমার মায়ের সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাও আবার বাংলাদেশে! এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না!

সাজ্জাদ আরও বলেন, প্রথমে আমরা ভারত যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু আর্থিক বিষয়টা একটু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল।
তার মতে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তবে চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখলে এবং তাদের সহযোগিতা করলে দেশেই অনেক জটিল ও আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে নিয়মিত লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম চালুর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন মাসে গড়ে দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

অস্ত্রোপচারে বিএমইউর ১৯টি বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল কাজ করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস। তার সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক মোহসেন চৌধুরী ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন।
বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী জানান, বিদেশে লিভার প্রতিস্থাপনে যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। বিএমইউ কিছু সময় বিনামূল্যে এ সেবা চালিয়ে যাবে। পরে অর্থের বিনিময়ে সেবা চালু করা হবে। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য খরচ ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে জানান তিনি।

বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহীনুল আলম বলেন, দেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের লিভারের রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর লিভারজনিত রোগে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার বড় কারণ সিরোসিস ও ক্যানসার। বছরে প্রায় এক হাজার রোগীর লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিএমইউতেই এ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন হয় ২০১০ সালের জুন মাসে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে। এরপর, ২০১১ সালে আরও একটি প্রতিস্থাপন হয়। এদিকে, বিএমইউ প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন করে ২০১৯ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০২৩ সালে। তবে এতদিন দেশে নিয়মিতভাবে এ চিকিৎসার সুযোগ ছিল না।