সকালে অ্যালার্ম বাজতেই চোখ খুলল, কিন্তু শরীর যেন কোনোভাবেই বিছানা ছাড়তে চাইছে না। মাথা জুড়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর ভার বোধ, শরীর ও মনে তীব্র ক্লান্তি এবং কাজে মনোযোগ দেওয়ার অক্ষমতা—দৈনন্দিন জীবনের এক চিরচেনা চিত্র। এক-দুদিন এমন হওয়া স্বাভাবিক হলেও, যদি প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথা ও ঝিমুনি ভাব লেগেই থাকে, তবে তা মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দৈনন্দিন কিছু অসচেতন অভ্যাস এবং ‘স্লিপ হাইজিন’ বা ঘুমের স্বাস্থ্য মেনে না চলাই এই সমস্যার প্রধান কারণ। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টিভি ৯-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে সকালের মাথাব্যথার পেছনের মূল কারণ ও এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
অনিয়মিত ঘুম ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কুফল
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে না ওঠা শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে (Circadian Rhythm) ব্যাহত করে। অনেকেই ভাবেন সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে কম ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে পূরণ করবেন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অতিরিক্ত সময় ঘুমানোও সকালের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হতে পারে। এছাড়া বিছানায় গিয়ে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল স্ক্রল করা বা ল্যাপটপে কাজ করার অভ্যাস ঘুমের মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করে। ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো মস্তিষ্কে ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় কাটালেও ঘুম গভীর হয় না। রাতে বারবার ঘুম ভাঙার কারণে সকালে উঠে মনে হয়, যেন ঘুমিয়েও শরীরে কোনো বিশ্রাম মেলেনি।
পানিশূন্যতা, ভুল ভঙ্গি ও ক্যাফেইনের প্রভাব
সকালের মাথাব্যথার একটি অত্যন্ত সাধারণ অথচ উপেক্ষিত কারণ হলো শরীরে পানির ঘাটতি বা পানিশূন্যতা। রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খেয়ে থাকার ফলে প্রাকৃতিকভাবেই শরীরে পানির স্তর নেমে যায়। বিশেষ করে আগের দিন পর্যাপ্ত পানি না খেলে বা রাতে নাক ডাকার কারণে মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে সকালে তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে। এর পাশাপাশি ঘুমানোর ভুল ভঙ্গি ও অনুপযুক্ত বালিশের ব্যবহারও সমানভাবে দায়ী। বালিশের উচ্চতা ঠিক না হলে ঘাড়ের পেশিতে অতিরিক্ত টান পড়ে, যা সকালে ঘাড় শক্ত হওয়া এবং মাথাব্যথার সৃষ্টি করে। আবার, রাতে চা বা কফি পানের অভ্যাস অনেকের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। যারা নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করেন, তারা হঠাৎ কফি খাওয়া কমিয়ে দিলেও ‘ক্যাফেইন উইথড্রয়াল’ জনিত মাথাব্যথায় ভুগতে পারেন।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি ও করণীয়
সকালে মাথাব্যথার সঙ্গে যদি রাতে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা বারবার জেগে ওঠার মতো সমস্যা থাকে, তবে তা ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (Sleep Apnea)-র লক্ষণ হতে পারে। এটি এমন একটি জটিল অবস্থা যেখানে ঘুমের মধ্যে সাময়িকভাবে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আবার চালু হয়। এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং সকালের মাথাব্যথাসহ দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দেয়।
এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস করতে হবে। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা, দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সঠিক বালিশ ব্যবহার ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করে। তবে ঘরোয়া অভ্যাস পরিবর্তনের পরও যদি সপ্তাহে বারবার বা প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা হতে থাকে, তবে দেরি না করে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: টিভি ৯