রংপুরে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন ও রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জোরালো হচ্ছে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় শতবছরের পুরোনো সদর হাসপাতালের ভবন এতোই জরাজীর্ণ যে সংস্কার করে পুনরায় চালু করা কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় পুরোনো হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব না হলে নতুন সদর হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে একটি জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, গত পাঁচ দশকে নতুন কোনো সরকারি হাসপাতাল গড়ে না ওঠায় রমেক হাসপাতালই এ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। এক হাজার শয্যার এ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসায় রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত সদর হাসপাতালটি একসময় রংপুরের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তবে স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এর কার্যক্রম সংকুচিত হতে থাকে। ১৯৭৬ সালে রমেক হাসপাতাল চালু হলে সদর হাসপাতালের কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ভবনটি কখনো টিকাদান কেন্দ্র, কখনো সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, আবার কখনো রমেক হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। করোনা মহামারির আগে পর্যন্ত সেখানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। বর্তমানে সেই কার্যক্রমও বন্ধ।

নগরীর প্রাণকেন্দ্রে রংপুর সিটি করপোরেশনের বিপরীতে অবস্থিত পুরোনো হাসপাতাল ভবনটি সরেজমিনে দেখা গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। একসময়ের লাল ভবনটি ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। মূল ফটক বন্ধ থাকলেও দুই পাশের লোহার গ্রিল নেই। ভেতরে কুকুর-বিড়াল ঘুরে বেড়ায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ভবনের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে চোরেরা। সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়, কখনো দিনের বেলায় চলে জুয়া। প্রবেশপথে এখনো ‘সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ’ লেখা থাকলেও সেখানে কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম নেই।
সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় রমেক হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে দুই থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। ভর্তি থাকেন আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। এক হাজার শয্যার বিপরীতে জনবল রয়েছে মাত্র ৬৫০ শয্যার উপযোগী। ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

নগরীর পশ্চিম প্রান্তে রমেক হাসপাতালের অবস্থান হওয়ায় দূরবর্তী এলাকা থেকে রোগীদের পৌঁছাতে সময় লাগে। বিশেষ করে যানজটে আটকে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে দেরি হলে তাদের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট রংপুরের সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেন। তাতে মহানগরীর বাইরে, তবে জেলা সদরের মধ্যে ঈশ্বরপুর ও হরিদেবপুর মৌজায় ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানে ২৫০ শয্যার জেলা বা সদর হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়।
পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রংপুর সদর উপজেলার জনসংখ্যা সাত লাখ ১৮ হাজারের বেশি। সদর উপজেলা ও আশপাশের এলাকার মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এ হাসপাতালে প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক জেলা প্রশাসক সম্মেলনে রংপুর সদরে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আনার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠানেও স্থানীয়রা হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে রমেক হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সদর হাসপাতালটি চালু করা গেলে চাপ কিছুটা কমত। পুরোনো ভবন সংস্কার করে চালু করা সম্ভব না হলে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, নতুন সদর হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ শুধু রংপুর নয়, পুরো বিভাগের মানুষের দাবি। শয্যা ও জনবলসংকটে একটি সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের বিকল্প ভাবা উচিত নয়।

রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, সদর উপজেলায় হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য স্থান উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ছাড়া আর কিছু করার নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মেশকাতুল আবেদ বলেন, সিলেট ও বরিশালে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি সদর হাসপাতাল রয়েছে। রংপুর বিভাগের আট জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় এখানেও বড় পরিসরের সদর হাসপাতাল প্রয়োজন।