বিকল্প ব্যবস্থা না করেই বন্ধ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সেন্টার। সেন্টারটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৯ নভেম্বর। কিন্তু এরপর রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, নতুন মেশিন স্থাপন করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেবা চালু করতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে জানা গেছে। ফলে এখানে সেবা নেওয়া ২৭৬ জন রোগীর চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু রাখতে নতুন মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মেশিন স্থাপন ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ সময় রোগীদের অন্যত্র ডায়ালাইসিস করাতে হতে পারে।

কিডনি রোগীদের অনেকেরই সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। চমেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেবা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। ফলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হলে সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করাতে মাসে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং তিনবার করাতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হতে পারে। ভর্তুকিযুক্ত সেবার ওপর নির্ভরশীল অনেক রোগীর পক্ষে এ ব্যয় বহন করা কঠিন।
২০১৭ সালের ৪ মার্চ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় চমেকে স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু হয়। সেন্টারটিতে ৩১টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি নেগেটিভ-প্রেশার ও সাতটি পজিটিভ-প্রেশার মেশিন। চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলীসহ এখানে কর্মরত ৪৫ জন।
স্যান্ডরের সহকারী ব্যবস্থাপক তায়েফ রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিসের খরচ ৩ হাজার ৩৯৭ টাকা থেকে কমিয়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে চুক্তি নবায়ন বা এ বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানানো হয়নি।

চুক্তির শুরুতে প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিসের খরচ ছিল ২ হাজার ১৯০ টাকা। প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ হারে বেড়ে তা বর্তমানে ৩ হাজার ৩৯৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রোগীরা দেন ৬২১ টাকা। বাকি অর্থ সরকার ভর্তুকি হিসেবে স্যান্ডরকে পরিশোধ করে।
কম খরচের চিকিৎসা বন্ধের শঙ্কা
ষাটোর্ধ্ব নার্গিস বেগম তিন বছর ধরে এই সেন্টারে ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। প্রতি সেশনে তাঁকে দিতে হয় ৬২১ টাকা। তাঁর একমাত্র ছেলে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। ছেলের সীমিত আয় থেকে মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। সেন্টারটি বন্ধ হলে কোথায় চিকিৎসা নেবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।
আট বছর বয়সী সন্তানকে দুই বছর ধরে এখানে ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন মানপতি দাশ। সপ্তাহে তিনবারের মধ্যে একবারও ডায়ালাইসিস বাদ পড়লে তাঁর সন্তান ছটফট করতে থাকে। সেন্টার বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি বলেন, আমরা চাই, চুক্তি আবার হোক। বাইরে আমাদের পক্ষে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব না। মরণ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।

চার বছর ধরে সেন্টারটিতে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন মোহাম্মদ রাকিবুল হোসাইন। তাঁর পজিটিভ-প্রেশার মেশিন প্রয়োজন, যা চট্টগ্রামের অল্প কয়েকটি হাসপাতালে রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের মেশিন থাকলেও চিকিৎসার ব্যয় তার সামর্থ্যের বাইরে। একইভাবে সীতাকুণ্ড থেকে স্বামীকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসা সাবিনা ইয়াসমিন এবং পতেঙ্গার নাসির উদ্দিনও কম খরচে বিকল্প চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চমেকের জন্য ৩১টি ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার নির্দেশ দিয়েছে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির জন্যও ৬০টি মেশিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বা কেনার প্রক্রিয়া চলছে। তবে মেশিন কেনার পাশাপাশি সেগুলো স্থাপন, প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

হাসপাতাল পরিচালক জানান, বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী স্যান্ডর মেশিন ও কর্মী সরবরাহ করে। পানি, বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন লাইনের মতো অবকাঠামোগত সুবিধা দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নতুন সেন্টার চালু না হওয়া পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো বিকল্প পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল ২৭৬ রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।