
ফাইল ফটো
চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। চলতি বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৬০৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩০৫ জন। আর গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৯৮ জন। অর্থাৎ জুলাইয়ের প্রথম ২১ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের চেয়ে বেশি।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জনের মধ্যে ১৮৪ জনই বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছরই জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। বছরের মোট আক্রান্তের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ রোগী এ পাঁচ মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬৭ জন। ওই বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৪৬। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন । তাদের মধ্যে নগরের সাতজন, জেলার বিভিন্ন উপজেলার ছয়জন এবং অন্য জেলার তিনজন। এ সময় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৯২ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন সীতাকুণ্ড উপজেলার এবং অন্যজন নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা।
বেশি আক্রান্ত সীতাকুণ্ডে
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন সীতাকুণ্ডে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন কর্ণফুলী উপজেলায়। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যেও সীতাকুণ্ডের তিনজন এবং চন্দনাইশ, রাউজান ও কর্ণফুলীর একজন করে বাসিন্দা রয়েছেন। চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর হচ্ছে না। বরং অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মতে, ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা হলো শরীরের তরলের (ফ্লুইড) সঠিক ব্যবস্থাপনা। জ্বর কমে যাওয়ার পর সাধারণত প্লাটিলেট কমতে শুরু করে। এ সময় রোগীর অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন হতে পারে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) লুৎফুল কবির বলেন, এবার অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর হচ্ছে না। শরীরে র্যাশও তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বমি, তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং লিভার ও কিডনির জটিলতা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। তাই জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পরিচালিত জরিপে চট্টগ্রামের প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এ মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকায় মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নগরের উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা—এই আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম জানান, হটস্পটগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম কাজ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ, ফগিং এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন