
মঙ্গলবার এমপিদের শপথ পড়াবেন সিইসি মন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সংবিধান অনুযায়ী শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এ অপশনটিই একমাত্র ত্রুটিমুক্ত পথ বলে মনে করছেন সরকার ও বিজয়ী দলের শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপি সংবিধানের বিধান মেনেই শপথ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। সে কারণেই নির্বাচনী ফলের গেজেট প্রকাশের পর তিন দিন অতিবাহিত হলে সিইসির কাছে তারা শপথ নিতে চান। বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান মঙ্গলবার বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গণমাধ্যমকে এ তথ্য দেন। এমপিদের শপথ গ্রহণের পর একই দিন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
গতকাল রাতে তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, নবনির্বাচিত এমপি প্রার্থীদের শপথ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত হবে। আর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ হবে বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়।
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ভোটবিহীন ছিল এই দেশ। ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী সরকার। চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনে পতনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনা ঘটে। ওই বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। পরের দিন ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। একই বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দেশে গণতন্ত্রের দুয়ার পুনরায় খুলে দিতে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় এই সরকার গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। সেদিন শান্তিপূর্ণভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ২৯৭ আসনের প্রাপ্ত ফলাফলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা ২১২টি আসনে জয়ী হয়ে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে ৭৭টি আসন পেয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ৮টি আসন। এখন তাদের শপথ নেওয়ার পালা।
তবে দেশে এক বিশেষ পরিস্থিতি চলমান থাকায় এই শপথ গ্রহণ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। নবনির্বাচিত এমপিদের কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং তার কোনো খোঁজ না থাকায় ও ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় এই প্রশ্ন ওঠে। তবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাইরে সংবিধান অনুযায়ী শপথ পড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হাতে। সে কারণে সিইসি এবার বিজয়ী প্রার্থীদের শপথ পড়াবেন। শপথ প্রক্রিয়া ত্রুটিমুক্ত রাখতেই এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে সরকার ও বিজয়ী দল। শপথ অনুষ্ঠান ১৬ ফেব্রুয়ারি না হলেও ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যেদিন সকালে এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও তাদের অপসারণ বিষয়ে বলা আছে। তবে এই দুটি পদে কেউ দায়িত্বে বহাল না থাকলেও বা পদ দুটি শূন্য হলেও ৭৪ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ(৬) অনুযায়ী তারা নতুন নির্বাচিতদের শপথ পড়াতে পারতেন; কিন্তু জটিলতা হচ্ছে, সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগের পর তার কোনো খোঁজ নেই এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। সে কারণে স্পিকার শপথ পড়াতে অক্ষম অবস্থায় রয়েছেন বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হন এবং তখন থেকে কারাগারে। ফলে তারও শপথ পড়ানোর আইনগত অবস্থা নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ১৩ ফেব্রুয়ারি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের শপথ এবং সরকার গঠন শুরু হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ফল ঘোষণার পর থেকে ক্ষণগণনা শুরু হবে। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিষয়টি সাংবিধানিকভাবেই হবে।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য ও আইনি সহায়তা প্রদান-সংক্রান্ত সাব-কমিটির প্রধান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি সাংবিধানিক বিধান মোতাবেক শপথ গ্রহণ করবে। সংবিধানের ১৪৮(২)(ক) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, গেজেট প্রকাশের পর তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। এখন যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, সেজন্য তিন দিন অপেক্ষা করে সিইসির হাতেই শপথ নেবেন নবনির্বাচিতরা।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইন অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ নিতে হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তাদের সংসদীয় নেতা নির্বাচন করবে। রাষ্ট্রপতি তখন তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।’
প্রেস সচিব শফিকুল আলম পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘শপথের প্রস্তুতির কাজ শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে। গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত চলছে।’
আরও পড়ুন