রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিক্সে (Appendix rupture) আক্রান্ত এক কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলা ঘটনায় উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গত শনিবার (৩ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষ শাহজাহানপুর থানায় মামলা দায়ের করেছে।
হাসপাতাল কতৃপক্ষের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ কিশোরীর মৃত্যুর পর ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ১০ লাখ টাকা দাবি করে তার স্বজনরা। টাকা না দেওয়ায় হামলা চালায় তারা।
জানা যায়, গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রচণ্ড পেটব্যথা নিয়ে কিশোরী মাহিমাকে মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাফি করা হলে তার অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগেই শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থলে থাকা অন্য এক রোগীর স্বজন বলেন, আমি আমার বোনকে নিয়ে গত শুক্রবার থেকে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। আমাদের পাশেই ঘটনাটি ঘটেছে। অ্যাপেনডিক্সের সমস্যা নিয়ে আসা রোগী মারা যাওয়ার পর তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাতে একদল লোক এসে টাকা দাবি করে।
তিনি আরও বলেন, সন্ধ্যার পর আবার তারা হাসপাতালে এসে প্রথমে ৮ থেকে ১০ জনকে মারধর করে রক্তাক্ত করে এবং ভাঙচুর চালায়। পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে হাসপাতালের স্টাফরা তাদের ধাওয়া দেন।
এদিকে, নিহত কিশোরীর স্বজনদের দাবি, পেটে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসার অবহেলায় শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা রোগীর মৃত্যুর পরদিন কয়েকজন যুবকসহ সবুজ নামের এক ব্যক্তি রোগীর স্বজন পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দেওয়ায় রাতে ৫০ থেকে ৬০ জন এসে হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুর করে।
হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডা. রাইয়ান হাসার বলেন, আমরা যে রোগীকে ইমাজেন্সি কিংবা আইসিইউতে পাঠাবো সেই সময়টুকুও আমরা পাইনি। যিনি এসেছিলেন তিনি আসলে রোগীর সারসরি আত্মীয় না। উনি ১২ থেকে ১৫ জনকে নিয়ে আসছিলেন। আসার পর উনি ১০ লাখ টাকা দাবি করেছেন।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনরা বিষয়টি বুঝতে পেরে লাশ নিয়ে গাজীপুরে চলে যান এবং রাতে দাফন সম্পন্ন করেন। পরে রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ার সবুজ নামে এক ব্যক্তি হাসপাতালে আসেন। তিনি শাহজাহানপুর ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের পরিচয় দিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন।
আবুল কালাম আরও বলেন, আমরা তাদের জানিয়েছি যে ভুল চিকিৎসা হয়ে থাকলে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারেন। এভাবে কাউকে টাকা দেওয়া হবে না। দুপুরে এ বিষয়ে আলোচনায় বসার কথা থাকলেও তারা আসেননি। বিকেলে প্রায় ১০০ লোক নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অবস্থান নেন।

তার দাবি, তিনি রোগীর স্বজনদের গেট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান নিতে বললে তারা মারধর শুরু করেন। পরে দ্বিতীয় তলায় লেবার রুমে উঠে ভাঙচুর চালান। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত হাসপাতালের ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হন।
তবে টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহরিয়ার সবুজ। তিনি বলেন, মাহিমা তার চাচাতো বোন। অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার পর প্রথমে তাকে প্যান প্যাসিফিক হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শাহরিয়ার সবুজ বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা অপারেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু রাতে অপারেশন না করায় পরদিন সকালে আমার বোন মারা যায়। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাইতে গেলে হাসপাতালের লোকজন আমাদের ওপর হামলা করে।
১০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি কোনো টাকা চাইনি, বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করতে চেয়েছে। আমরা তাতে রাজি হইনি। আমরা বলেছি, কোটি টাকা দিলেও আমরা রাজি হবো না। তারা যদি বলে আমরা টাকা চেয়েছি, তাহলে এর প্রমাণ দিক।

পরে হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। মতিঝিল জোনের এডিসি মোহাম্মদ রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়ে ইট পাটকেল ছুড়ছিল। আমরা এসে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেই। তারা যদি মামলা দায়ের করেন তাহলে ওইটার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।