নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় পান করলে বাড়তে পারে পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত একবার চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন, এমন ব্যক্তিদের পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি; যারা এ ধরনের পানীয় পান করেন না—এমন ব্যক্তিদের তুলনায় ২ দশমিক ৪৫ গুণ বেশি। নারী ও পুরুষ—উভয় দলের ক্ষেত্রেই এ সম্পর্ক দেখা গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ৩ দশমিক ০৪ গুণ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে এক দশমিক ৯৯ গুণ।
মেডস্কেপ মেডিকেল নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ‘গ্যাস্ট্রো হেপ অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, চিনিযুক্ত পানীয় পানের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্পর্ক নিয়ে এটিই প্রথম গবেষণা।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষক অ্যান্ড্রু টি. চ্যানের নেতৃত্বে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নার্সেস হেলথ স্টাডি এবং হেলথ প্রফেশনালস ফলো-আপ স্টাডির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় মোট এক লাখ ১২ হাজার ২৮৪ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৬৮ হাজার ৩১১ জন নারী এবং ৪২ হাজার ৯৭৩ জন পুরুষ। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যানসারের ২৭৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়।
গবেষণায় চিনিযুক্ত পানীয় হিসেবে কার্বনেটেড পানীয়, ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, লেমোনেড ও স্পোর্টস ড্রিংকস বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয়ের মধ্যে ছিল কম ক্যালরিযুক্ত কার্বনেটেড পানীয়।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, চিনিযুক্ত পানীয়তে থাকা ফ্রুক্টোজের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। ফ্রুক্টোজ গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকির হার ছিল ১ দশমিক ৬১ গুণ। তবে বয়সসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পর কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয় পানের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
পাকস্থলীর ক্যানসারের অন্যতম ঝুঁকির কারণ হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (এইচ পাইলোরি) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের একটি উপদলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, চিনিযুক্ত কিংবা কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয় পানের সঙ্গে এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কোনো সম্পর্ক নেই।

গবেষকদের ধারণা, চিনিযুক্ত পানীয় পানের ফলে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন, স্টেরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ, ডিএনএর ক্ষতি এবং অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যে পরিবর্তনের মতো বিষয় পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।
গবেষক অ্যান্ড্রু টি. চ্যান বলেন, ফ্রুক্টোজের বিপাকীয় প্রভাব কিংবা পানীয় থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে ওজন বৃদ্ধির মতো বিষয় চিনিযুক্ত পানীয়ের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে। এসব প্রভাব কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
কৃত্রিম মিষ্টিকারক ও ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণার ফলাফল এখনো মিশ্র। স্যাকারিন, অ্যাসপারটেম, অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম, সুক্রালোজ, নিওটেম ও অ্যাডভানটেমের মতো কয়েকটি কৃত্রিম মিষ্টিকারক যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। মানুষের মধ্যে ক্যানসার বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ না পাওয়ার ভিত্তিতে এসব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এ গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতা হলো, চিনিযুক্ত পানীয় পানকারীদের অন্যান্য খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরন পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব বিষয়ও ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে শুধু চিনিযুক্ত পানীয়কেই ক্যানসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
বিশ্ব ক্যানসার গবেষণা তহবিল ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল ক্যানসার আপডেট প্রোগ্রামের আওতায় ৫১টি গবেষণার তথ্য নিয়ে করা একটি পর্যালোচনাতেও চিনিযুক্ত পানীয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ক্যানসারের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোলোরেক্টাল বা বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসার এবং স্থূলতাসংশ্লিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসার। তবে কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে প্রমাণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কিছু গবেষণায় এর সঙ্গে লিউকেমিয়ার সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা নিশ্চিত নয়।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক আহমাদ জায়েদি বলেন, নতুন গবেষণাটি পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়ে আগের সীমিত গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। তবে ক্যানসারের ঘটনা তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং এইচ পাইলোরি সংক্রমণ ও পাকস্থলীর কোন অংশে টিউমার হয়েছে—এসব বিষয় আরও বিস্তারিতভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, চিনিযুক্ত পানীয় ও ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে জনস্বাস্থ্য পর্যায়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে ব্যক্তির ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করা উচিত নয়। বর্তমান প্রমাণ মূলত জনসংখ্যাভিত্তিক পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা থেকে পাওয়া, যা দিয়ে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।

গবেষকদের পরামর্শ, সম্ভব হলে চিনিযুক্ত ও কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি এবং চিনি ছাড়া অন্যান্য পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম মিষ্টিকারকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিকারকের পৃথক প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।