রাজধানীর বেসরকারি চারটি মেডিকেল কলেজকে রোগী দিয়ে সহায়তা করবে সরকার। কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণে এসব রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ সরকার বহন করবে। তবে রোগীপ্রতি খরচের পরিমাণ এবং বে বিল পরিশোধের পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
হাসপাতাল চারটি হলো– রাজধানীর তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, গুলশানের সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। পাইলট প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে হাসপাতালগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। পরে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব কলেজের নিজস্ব হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী না থাকায় হাতে-কলমে চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার ঘাটতি নিয়ে চিকিৎসক হয়ে বের হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নতুন হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা ব্যবহার করলে সরকারের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল নির্বাচন, রোগী পাঠানো, চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা এবং বিল পরিশোধে স্বচ্ছতা না থাকলে এ উদ্যোগে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর আগে, গত ৪ অক্টোবর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশের সরকারি হাসপাতাগুলোতে রোগীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসাসেবা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
তিনি জানান, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি হাসপাতাল থেকে নির্বাচিত রোগী পাঠানো হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় বহন করবে সরকার।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগী কম। তাই সরকারি হাসপাতাল থেকে সেখানে রোগী পাঠানো হলে চাপ অনেকটা কমবে।
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ, বেসরকারিতে শয্যা খালি
স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যদিকে, কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তুলনামূলকভাবে অনেক শয্যা খালি পড়ে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে চারটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে রোগী স্থানান্তরের প্রক্রিয়া, ব্যয় পরিশোধ ও তদারকির নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নির্বাচিত হাসপাতালগুলো হলো তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানগুলোর শয্যাসংখ্যা যথাক্রমে ৫০০, ৪০০, ৫০০ ও ৫০০। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের একটি দল হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও সেবাদানের সক্ষমতা যাচাই করেছে।

শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে তাঁদের হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে এবং সরকার বিল পরিশোধ করবে। তাঁর মতে, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিভাগের রোগীদের একটি অংশ বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো গেলে সরকারি হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় রোগী রাখার চাপ কমবে।
বেসরকারি ২ হাসপাতালের চিত্র
সম্প্রতি ইমপালস ও শমরিতা হাসপাতালে গিয়ে রোগীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সরকারের একাধিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিস্তারিত জানা যাবে। হাসপাতাটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
শমরিতা হাসপাতালে সেদিন ৬৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলেও রোগী কম থাকায় শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান না। মেডিকেল শিক্ষানীতির হিসাবে ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ শয্যার হাসপাতাল প্রয়োজন। তবে শুধু শয্যা থাকলেই হবে না, পর্যাপ্ত রোগীও থাকতে হবে।
সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী
স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যা ২ হাজার ৬০০ হলেও প্রতিদিন প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ১ হাজার ৩৫০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ অনেক বেশি।

স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, নতুন করে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে কয়েক বছর সময় ও ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। এর বদলে বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা কাজে লাগানো গেলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব।
রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়া ও ব্যয়
খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয় থাকবে। কোন রোগীকে কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় পাঠানো হবে, তা নির্ধারণে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। শয্যাভাড়া, কনসালট্যান্ট ফি, সরকার নির্ধারিত ওষুধ ও সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় সরকার বহন করবে। মাস শেষে সেবার হিসাব অনুযায়ী হাসপাতালকে বিল পরিশোধ করা হবে।

তবে রোগী পরিবহন, জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব বণ্টন এবং অস্ত্রোপচারের সুযোগসহ বেশ কিছু বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, কোন হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন রোগী পাঠানো ও চিকিৎসার পরিধি নিয়ে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে।
সফটওয়্যারে নজরদারির পরিকল্পনা
সরকারি অর্থের ব্যবহার ও অনিয়ম ঠেকাতে রোগী রেফারাল থেকে ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা ও ছাড়পত্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সফটওয়্যারে নথিভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালের কার্যক্রম তদারকিতে সাত সদস্যের পর্যবেক্ষণ কমিটি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভুয়া রোগী দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অতিরিক্ত বিলের মতো অনিয়ম কমানোর আশা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
হাসপাতাল বাছাই নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান বলেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতাল বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা উচিত। চিকিৎসার মান, জনবল ও অবকাঠামো যাচাইয়ের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। কোন হাসপাতাল কী ধরনের রোগীর চিকিৎসা দেবে এবং সরকার কোন সেবার জন্য কত টাকা পরিশোধ করবে, তা-ও স্পষ্ট করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর তদারকি না থাকলে রোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অতিরিক্ত বিলের সুযোগ তৈরি হতে পারে। করোনা মহামারির সময় বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিল যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
সরকারি অবকাঠামো ও ঢাকার বাইরের চিকিৎসা
বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের আগে সরকারি অব্যবহৃত অবকাঠামো কাজে লাগানোর বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। করোনাকালে তৈরি এক হাজার শয্যার ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালে ২১২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ হাসপাতালটির অব্যবহৃত সক্ষমতা সাধারণ চিকিৎসায় কাজে লাগানোর সম্ভাবনা যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ও অধ্যাপক বেনজির আহমেদের মতে, শুধু ঢাকার হাসপাতালের চাপ কমালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চারটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর পাইলট প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। তা চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্প শুরু হবে। রোগীদের সেবা ও প্রকল্পের ফলাফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: সমকাল