মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় টিউমার ধ্বংস করে শিশুর জীবন রক্ষা করে নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছেন চীন ও হংকংয়ের একদল চিকিৎসক। দ্রুত বর্ধনশীল টিউমারে আক্রান্ত অনাগত শিশুকে বাঁচাতে অভূতপূর্ব অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন তারা। তাদের এ সাফল্য মাতৃ-ভ্রূণ চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মায়ের পেট ও জরায়ুর দেয়াল ভেদ করে আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে গর্ভস্থ শিশুর বুকের টিউমারে বিশেষ সূঁচ প্রবেশ করিয়ে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের তিন দিনের মধ্যে টিউমারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং শিশুর পেটে জমে থাকা তরলও সম্পূর্ণ সেরে যায়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীনের শেনঝেন বাওআন উইমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হাসপাতাল এবং হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকরা যৌথভাবে এ চিকিৎসা দেন। তাদের গবেষণাটি গত ২০ আগস্ট ‘Ultrasound in Obstetrics & Gynecology’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
চীনের বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম অ্যাডভান্সড লাইফ সায়েন্স ১৫ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে এ সাফল্যকে ভ্রূণের কঠিন টিউমারের ন্যূনতম আক্রমণাত্মক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০ বছর বয়সী ওই নারী ২২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালে গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসে জন্মগত ত্রুটি ধরা পড়ে। মাইক্রোসিস্টিক কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফরমেশন (সিপিএএম) নামের এ সমস্যায় ভ্রূণের ফুসফুসের টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত ক্ষতিকর না হলেও দ্রুত বেড়ে ওঠা এ টিউমার হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা এবং শরীরে অতিরিক্ত তরল জমার মতো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার আকারের টিউমারটি শিশুর বুকের ডান পাশের পুরো অংশ দখল করে হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। শিশুর পেটেও বিপজ্জনকভাবে তরল জমেছিল।

সাধারণত এ ধরনের সমস্যায় জমে থাকা তরল বের করা বা টিউমারের প্রধান রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু টিউমারটি অসংখ্য ক্ষুদ্র সিস্ট দিয়ে গঠিত হওয়ায় এবং এতে প্রধান কোনো রক্তনালি না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতি কার্যকর ছিল না।
চিকিৎসকরা উচ্চমানের রিয়েল-টাইম আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে টিউমারের অবস্থান নির্ণয় করেন। এরপর মায়ের পেট, জরায়ুর দেয়াল ও ভ্রূণের বুকের দেয়াল ভেদ করে বিশেষ অ্যাবলেশন সূঁচ টিউমারের কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়। মাইক্রোওয়েভের তাপে টিউমারের টিস্যু ধ্বংস করা হয়। তাপ প্রয়োগে সময় লাগে মাত্র দুই মিনিট। পুরো প্রক্রিয়ায় শিশুর সুস্থ অঙ্গগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন চিকিৎসকেরা।

অবশেষে, মায়ের গর্ভে প্রায় ৩৭ সপ্তাহ থাকার পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের সময় নবজাতকটির ওজন ছিল ২ দশমিক ৯ কেজি এবং অ্যাপগার স্কোর ছিল ১০। চার মাস বয়সেও শিশুটি সুস্থ রয়েছে। এছাড়া, নতুন করে কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি।