দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় ছোটখাটো অনেক বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। যেমন—হাতে মোবাইল ফোন বা চাবি নিয়ে সারা ঘর খুঁজে বেড়ানো, কিংবা কোনো জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে করতে না পারা। মাঝেমধ্যে এমন হওয়া স্বাভাবিক হলেও এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তবে তা মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
ভারতীয় নিউরোলজিস্ট ডা. অংশু সেনের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়লেও স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগের ঘাটতি শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়; এটি শিশু ও তরুণদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে।
স্মৃতিশক্তি হ্রাসের নেপথ্যে যেসব কারণ
শিশুদের অমনোযোগ: শিশুদের পড়া মনে না থাকার বা ভুলে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মনোযোগের অভাব।

স্নায়বিক রোগ: বয়স্কদের ক্ষেত্রে বারবার ভুলে যাওয়ার পেছনে অ্যালজাইমারস বা পারকিনসন্সের মতো জটিল স্নায়বিক রোগ দায়ী থাকতে পারে।
পোস্ট-ট্রমাটিক অ্যামনেশিয়া: দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলেও স্মৃতিশক্তিতে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক অ্যামনেশিয়া’ বলা হয়।
দীর্ঘদিনের বিষণ্ণতা: দীর্ঘস্থায়ী ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদের কারণে মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, যা ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
মস্তিষ্ক ও স্মৃতি যেভাবে কাজ করে

মানুষের স্মৃতি, চিন্তা ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্ক প্রধান ভূমিকা পালন করে। মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ হলো ‘সেরিব্রাম’, যা সেরিব্রাল কর্টেক্স নামের একটি আবরণ দিয়ে ঢাকা থাকে। মানুষের চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি ও স্মৃতির মতো উচ্চতর জ্ঞানীয় কার্যক্রম এই সেরিব্রাল কর্টেক্স দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া মস্তিষ্কের ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ অংশটি স্মৃতি গঠন ও সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো রোগের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে।
ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে চিকিৎসকদের পরামর্শ
মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞরা জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন:
মানসিক অনুশীলন: মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখতে সুডোকু মেলানো, পাজল সমাধান, বই পড়া, পছন্দের গান শোনা, গান গাওয়া কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মতো মানসিক চর্চায় যুক্ত হওয়া।
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলা, যা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও চাপমুক্ত জীবন: মানসিক চাপ কমাতে নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা এবং নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়া।

ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন: ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করে, তাই এগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলা।
পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস: দৈনিক খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, তাজা ফলমূল, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ এবং পুষ্টিকর খাবারকে প্রাধান্য দেওয়া।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
পরিচিত মানুষ, চেনা জায়গা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি একদমই মনে না পড়ে এবং এই সমস্যা দিন দিন দ্রুত বাড়তে থাকে, তবে নিজে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।