পাবনার ফরিদপুর উপজেলা সদরের আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পর ১১ প্রসূতির ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। একই হাসপাতালে গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হওয়া আরও একজনের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা ধরা পড়েছে। মে–জুন মাসে হাসপাতালটিতে প্রায় ১২০ জন প্রসূতির অস্ত্রোপচার হয়। এ ঘটনায় তদন্তে নেমেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
উপজেলা সদরের থানাপাড়া এলাকার জয়া রানী দাসের বয়স ২০ বছরের কাছাকাছি। ২২ মে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সেদিনই অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দেন। ২৪ মে সন্তানসহ বাড়ি ফেরেন। ২৯ মে হাসপাতালে গিয়ে সেলাই কাটাসহ ক্ষতস্থান ড্রেসিং করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খান। কিন্তু দুই সপ্তাহ পরও পেটের ক্ষত শুকায়নি। বরং পুঁজ ও রস বের হতে থাকে। একাধিকবার হাসপাতালে গিয়ে ওষুধ খেলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।

পরে ক্ষতস্থান থেকে মাংসের নমুনা রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং জয়াকেও রাজশাহীতে পাঠানো হয়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষায় ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। এরপর জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাগজপত্র অনুযায়ী, ২৫ জুলাই থেকে জয়া রানী সরকারি কর্মসূচির বিনা মূল্যের যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করছেন।
ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রাশেদুল হাসান বলেন, আল-মদিনা হাসপাতালে মে–জুনে অস্ত্রোপচার হওয়া ১২ জনের পরবর্তী সময়ে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার এবং ১১ জনের প্রসবে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। যক্ষ্মার উৎস শনাক্ত করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। তাঁরা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখেছেন, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করেছেন। সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধানে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাসপাতালের কিছু যন্ত্রপাতি পুরোনো। অস্ত্রোপচার আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকেও বিষয়টি জানিয়ে যথাযথ অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হয়েছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদসহ আইইডিসিআর ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একটি দল শনিবার সন্ধ্যায় পাবনায় পৌঁছেছে।
আল-মদিনা হাসপাতালটি ফরিদপুর উপজেলা সদরের তেঁতুলতলা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। এটি ১০ শয্যার হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ১০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনায় স্থায়ী তিনজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, লেবার রুম, ওটি, ৮০০ বর্গফুটের ওয়ার্ড ও ইমার্জেন্সি রুম থাকার কথা। এসব শর্ত পুরোপুরি না মেনেই হাসপাতালটি ২০২০ সাল থেকে চলছে।

সরেজমিনে ৮০০ বর্গফুটের কোনো কক্ষ পাওয়া যায়নি। অস্ত্রোপচারকক্ষ পরিষ্কার দেখা গেলেও দুটি পুরোনো অটোক্লেভ যন্ত্রের পাশাপাশি নতুন একটি অটোক্লেভ আনা হয়েছে, যা এক দিনও ব্যবহার করা হয়নি। স্বাভাবিক প্রসবের কক্ষেও কোনো শয্যা দেখা যায়নি।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা জানান, প্রতিদিন দুই–তিনটি এবং মাসে ৬০–৭০টি প্রসব অস্ত্রোপচার হয়। প্রসবে অস্ত্রোপচারই হাসপাতালের আয়ের প্রধান উৎস। তবে কিছু স্বাভাবিক প্রসবও হয়। প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিটি প্রসব করানোর ক্ষেত্রে লেবার রুম প্রটোকল বা প্রসবকক্ষ নির্দেশিকা মেনে চলা জরুরি। তবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ওটি ইনচার্জ মো. আরিফুল ইসলাম কোনো নির্দেশিকা দেখাতে পারেননি এবং এমন নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন—এটিও তাঁরা জানেন না। তাঁরা প্রতিটি অস্ত্রোপচারের পর যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার দাবি করলেও এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

ওটি ইনচার্জ আরিফুল ইসলাম বলেন, যক্ষ্মার সম্ভাব্য উৎস দুটি—কোনো রোগী অথবা ওটি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, ‘আমাদের জন্য এটা অনেক বড় ঘটনা। সংক্রমণের দায় এড়ানো মুশকিল। আমাদেরও জানতে হবে, কীভাবে ঘটনা ঘটল।’
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকে প্রসবে অস্ত্রোপচারের সময় বেশ কিছু প্রসূতির শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটে। জুনে আইইডিসিআর ও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির যৌথ তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম জানান, একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার হওয়া ৫১ জনের শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। মার্চ থেকে ক্লিনিকটির অস্ত্রোপচারকক্ষ বন্ধ রয়েছে, তবে ডায়াগনস্টিক সেবা চালু আছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, তাঁরা পাবনা ও শরীয়তপুরের দুটি উপজেলার ঘটনা জানেন। তবে একটি বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের চার জেলার চারটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁরা জানতে পেরেছেন, ওই হাসপাতালগুলোতেও প্রায় নিয়মিত ক্ষতস্থানে যক্ষ্মার রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যক্ষ্মাপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৪৪ হাজার মারা যান।
যক্ষ্মাবিশেষজ্ঞ, প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পাবনা ও শরীয়তপুরের ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগকে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে যেন অযথা ভীতি তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

জ্যেষ্ঠ প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশান আরা বেগম এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, ব্যবহারের আগে হাসপাতালের অস্ত্রোপচারকক্ষ ও যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া ঠিকমতো প্রতিপালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো