মাত্র দুই মাস বয়স। কান্না ছাড়া নিজের কষ্ট জানানোরও বয়স হয়নি শিশু সাবিহা ইসলাম রোজার। অথচ নিষ্পাপ শিশুটিকে তার নিজের পিতার হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এক হাত ভাঙা, সারা শরীরে কালশিটে আর গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সে। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানল শিশুটি।
আজ রোববার (০৬ সেপ্টেম্বর) ঢামেক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে শিশু রোজা।
এর আগে, গত ২২ আগস্ট সকালে মা লাবণী জান্নাত রোজাকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ক্যাজুয়ালটিতে নিয়ে আসেন। তার সঙ্গে ছিল মাত্র ৭০০ টাকা। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাকে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, জ্ঞান কমে যাওয়া এবং সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে শিশুটিকে আনা হয়েছিল। হাত বা বালিশ চাপা দিয়ে তার শ্বাস বন্ধের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, শিশুটির ওপর চালানো নির্মমতা তাঁদেরও হতবাক করে দিয়েছিল।
শিশু রোজাকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত লড়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। যে বয়সে মায়ের কোলে নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে পৃথিবী ছাড়ল দুই মাসের নিষ্পাপ শিশুটি।
রোজার চিকিৎসায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। অর্থ সংকটে থাকা রোজার মাকে চিকিৎসকরা প্রথমে তিন হাজার টাকা দেন। পরে বিভাগে আরও পাঁচ হাজার টাকা জমা রাখা হয়। চিকিৎসকদের বিভাগীয় তহবিল ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোট ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামানও শিশুটির প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

শিশুটির চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন ঢামেকের শিশু সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. নাহিদ উজ জামান। মানবিক কারণে শিশু সার্জারি বিভাগের জন্য বরাদ্দ আইসিইউ বেড ক্যাজুয়ালটি বিভাগকে ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
রোজার মা লাবণী জান্নাত জানান, ২২ আগস্ট ভোর ৪টার দিকে তিনি মেয়েকে ভালো অবস্থায় দেখেছিলেন। সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভেঙে দেখেন, শিশুটির শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন এবং গলায় কালচে দাগ। এ সময় স্বামী হৃদয় খানকে বাসায় পাওয়া যায়নি। লাবণীর অভিযোগ, এর আগেও কান্না করার কারণে হৃদয় রোজাকে মারধর করেছিলেন।

মিরপুর-১-এর মাজার রোডে থাকতেন হৃদয়-লাবণী দম্পতি। হৃদয় আগে একটি বিরিয়ানির দোকানে কাজ করলেও বর্তমানে বেকার। লাবণী অনলাইনে একটি এজেন্সিতে চাকরি করে সংসার চালান। প্রেমের সম্পর্কের কারণে হৃদয়ের পরিবার তাঁদের বিয়ে মেনে নেয়নি। লাবণীর নিজের বাবা-মাও বেঁচে নেই। ফলে মেয়ের চিকিৎসার পুরো লড়াই তাকেই একা চালাতে হয়েছে।
লাবণীর অভিযোগ, ঘটনার পর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে ফোন করে দেড় হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে মামলা না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তখন তার একমাত্র চিন্তা ছিল মেয়েকে বাঁচানো।