দেশের উপকূলীয় এলাকার মাছের শুঁটকিতে ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে সংগ্রহ করা ছয় প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির শুঁটকি পরীক্ষা করে প্রতিটি নমুনাতেই প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কুয়াকাটার শুঁটকিতে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে কক্সবাজারের শুঁটকি।
গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী মেরিন পলিউশন বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালিত করেন। এতে নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুথি।
গবেষকরা দেশের শুঁটকি উৎপাদনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। ছয় প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির মোট ২৪টি নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লইট্টা, পোয়া, ছুরি, ফাইস্যা মাছ এবং হরিণা ও বাগদা চিংড়ি। সব নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স অনুযায়ী, কুয়াকাটার শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সূচক ছিল ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। কক্সবাজারের শুঁটকিতে এই মান ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১। গবেষণায় শনাক্ত প্লাস্টিক কণার মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিনের উপস্থিতি ছিল বেশি।
গবেষকদের মতে, উপকূলীয় জলজ পরিবেশে জমা হওয়া পৌর, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক কণা তৈরি হয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পরে সেই মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির সময়ও এসব কণা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। তবে এই গবেষণায় শুঁটকি খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে বা এর নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যপ্রভাব কী, তা নির্ণয় করা হয়নি।

অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান বলেন, দেশে ব্যাপকভাবে শুঁটকি উৎপাদিত হলেও তা কতটা মানসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে মাছের লার্ভার আক্রমণ ও অপচয় রোধে ডিডিটি ও নগভসের মতো ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। শুঁটকিতে রাসায়নিক দূষণের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিও উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশদূষণের কারণে উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য জমছে। এসব বর্জ্য ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখান থেকে মাছের মাধ্যমে শুঁটকিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে।
মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই গবেষক। তাঁর মতে, খোলা জায়গায় শুঁটকি শুকানোর পরিবর্তে ছাদযুক্ত বা সোলার ড্রায়ারের মতো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় শুকানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো ও প্যাকেটজাত করার কাজে প্লাস্টিক শিট ও সিনথেটিক দড়ির ব্যবহার কমাতে হবে, যাতে প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় মাছের সঙ্গে প্লাস্টিক কণা মিশে না যায়।

উপকূলীয় এলাকায় পৌর ও শিল্পবর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি জানিয়ে অধ্যাপক আশরাফুল আজম বলেন, ভোক্তাদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি নজরদারি, কার্যকর নীতিমালা এবং শুঁটকি উৎপাদনে মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এসব উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।