বয়স্কদের পাশাপাশি এখন তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে স্ট্রোকের প্রকোপ। যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঞ্চলে গত প্রায় তিন দশকের চিকিৎসাতথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেড়েছে ৮৩ শতাংশ।
একই সময়ে স্ট্রোকের পর রোগীদের বেঁচে থাকার হারও বেড়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাতে হতে পারে, এমন তরুণের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নিউরোলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সিনসিনাটি ও উত্তর কেনটাকি অঞ্চলের ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চিকিৎসাতথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির চিকিৎসক এমিলি আর ফিশার বলেন, তরুণদের মধ্যে স্ট্রোক ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আরও বেশি মানুষ বেঁচে থাকছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাতে হতে পারে, এমন তরুণের সংখ্যাও বাড়তে পারে।

গবেষকেরা ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চিকিৎসাতথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমবার স্ট্রোকে আক্রান্ত ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সী ২ হাজার ৭৬ জনকে শনাক্ত করেন। এতে দেখা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৯। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ২-এ। অর্থাৎ আক্রান্তের হার বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ বৃদ্ধির বড় অংশের জন্য দায়ী ইস্কেমিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে এ ধরনের স্ট্রোক হয়। এতে মস্তিষ্কের কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছানো ব্যাহত হয় এবং দ্রুত কোষের ক্ষতি হতে পারে।

১৯৯৩-৯৪ সালে প্রতি এক লাখ তরুণের মধ্যে ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৮। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪৭ দশমিক ৩-এ পৌঁছায়। তবে মস্তিষ্কের ভেতরে বা চারপাশে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে একই ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়নি।
বাড়ছে বিভিন্ন ঝুঁকির উপস্থিতি
গবেষকেরা স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের শারীরিক সমস্যা ও জীবনযাপনের অভ্যাসও বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারের মতো সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো আরও সাধারণ হয়ে উঠেছে।
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হলো হৃদস্পন্দনের অনিয়মিত অবস্থা। এতে হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বেঁধে তা মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ করে দিতে পারে, যা ইস্কেমিক স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
গবেষণায় মাদক ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশের মাদক ব্যবহারের তথ্য নথিভুক্ত ছিল। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে ৪০ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। এ বৃদ্ধির বড় অংশের সঙ্গে গাঁজা ব্যবহারের সম্পর্ক ছিল।

তবে এসব ঝুঁকির কারণই স্ট্রোক বৃদ্ধির জন্য দায়ী, তা গবেষণায় নিশ্চিত করা যায়নি। কারণ, স্ট্রোকে আক্রান্ত হননি এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করার মতো স্বাস্থ্যতথ্য গবেষকদের কাছে ছিল না।
বেঁচে থাকার হার বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার শঙ্কা
গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মারা যাওয়া রোগীর হার ১৯৯৩-৯৪ সালের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২০ সালে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বয়স, জাতিগত পরিচয় ও লিঙ্গের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই এ হিসাব করা হয়েছে। মস্তিষ্কের ভেতরে ও চারপাশে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্তদের মৃত্যুহার কমার বিষয়টি বেশি লক্ষণীয় ছিল।
তবে স্ট্রোকের পর বেঁচে থাকলেই পুরোপুরি সুস্থ হওয়া নিশ্চিত নয়। মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা ও অবস্থান অনুযায়ী চলাফেরা, কথা বলা ও স্মৃতিশক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তরুণ বয়সে স্ট্রোক হলে এসব জটিলতা নিয়ে কয়েক দশক পর্যন্ত জীবন কাটাতে হতে পারে।

চিকিৎসক এমিলি আর ফিশার বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরুর দিকেই স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কেন তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। তাই দেশজুড়ে একই প্রবণতা রয়েছে কি না কিংবা স্ট্রোক বৃদ্ধির পেছনে কোন বিষয়গুলো দায়ী, তা এ গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি