নারীদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বেশি। এর পেছনে দীর্ঘায়ুর পাশাপাশি মেনোপজেরও ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। মধ্যবয়সে মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এতে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে, যা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গত সপ্তাহে নেচার মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় মেনোপজের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য সম্পর্কের নতুন কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, এ সময়ে রক্তে মস্তিষ্কের কার্যক্রম, প্রদাহ ও স্নায়ুকোষের অবক্ষয়জনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রাইলি বোভের মতে, মেনোপজ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। তবে কীভাবে এ পরিবর্তন মস্তিষ্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তা শনাক্ত করা জরুরি।
মেনোপজে মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে
মেনোপজের সময় ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের উৎপাদন কমে যায়। একই সময়ে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোনের (এফএসএইচ) মাত্রা বেড়ে যায়। হরমোনের এ পরিবর্তনের সঙ্গে হট ফ্ল্যাশ, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ঘুমের সমস্যা ও মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় তীব্র বা ঘন ঘন হট ফ্ল্যাশের সঙ্গে মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থে ক্ষতচিহ্নের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে ডিমেনশিয়া ও স্ট্রোকের ঝুঁকির যোগসূত্র রয়েছে। মেনোপজের সময় অনেক নারী স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা ও চিন্তাভাবনায় ধীরগতির মতো সমস্যায়ও ভোগেন। এসব উপসর্গকে একত্রে ‘ব্রেন ফগ’ বলা হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিকভাবে কিংবা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয় অপসারণের কারণে যেসব নারীর তুলনামূলক কম বয়সে মেনোপজ হয়, তাঁদের আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তবে বয়স বৃদ্ধি নিজেই ডিমেনশিয়ার অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তাই মেনোপজের প্রভাবকে বয়সজনিত পরিবর্তন থেকে আলাদা করা কঠিন।
রক্তে ১৬ ধরনের প্রোটিন শনাক্ত
মেনোপজের সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সম্পর্ক অনুসন্ধানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর স্নায়ুমনোবিজ্ঞানী ক্যাটলিন ক্যাসালেত্তোর নেতৃত্বে গবেষকেরা ৮০ জন সুস্থ নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মধ্যে মেনোপজ-পূর্ববর্তী, পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা নারী ছিলেন। কেউই মেনোপজের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে হরমোন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন না।
গবেষণায় মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের রক্তে মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৬ ধরনের প্রোটিনের মাত্রা মেনোপজ-পূর্ববর্তী নারীদের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি প্রোটিন আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। কয়েকটি প্রোটিন স্নায়ুকোষ ও তাদের মধ্যকার সংযোগস্থলের সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। যেসব নারী রাতে ঘাম হওয়ার কথা জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে প্রদাহসংশ্লিষ্ট সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রাও বেশি ছিল।

গবেষণাটির প্রথম লেখক ও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গবেষক ম্যাডেলিন উড আলেকজান্ডারের মতে, মেনোপজের পরিবর্তনকালীন পর্যায়ে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রোটিনের মাত্রার সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনেরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে এফএসএইচের মাত্রা বেশি থাকা এবং ইস্ট্রোজেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ ইস্ট্রাডিওলের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে এসব প্রোটিনের সম্পর্ক রয়েছে। ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এফএসএইচ আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন ত্বরান্বিত করতে পারে। এ হরমোনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করলে ওই প্রক্রিয়া থামানোর সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
গবেষকেরা ষাটোর্ধ্ব ও সত্তরের দশকের বয়সী প্রায় ১২ হাজার নারীর স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যাঁদের চিন্তাশক্তির অবনতি বা ডিমেনশিয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকের মধ্যেও একই ধরনের প্রোটিনের মাত্রা বেশি ছিল।
তবে গবেষণাটিতে মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীর সংখ্যা কম ছিল। রক্তে প্রোটিনের মাত্রাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
প্রতিরোধে আগাম শনাক্তকরণের আশা
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের নারীস্বাস্থ্য গবেষক রেবেকা থার্স্টন ও তাঁর দল মেনোপজের কাছাকাছি পর্যায়ে থাকা শত শত নারীকে নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি গবেষণার পরিকল্পনা করছেন। এতে মস্তিষ্কের ইমেজিং, রক্তের বায়োমার্কার এবং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হবে। অন্য একটি গবেষণা উদ্যোগেও মেনোপজের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে নারীদের মস্তিষ্কের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হবে।

গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রোটিনের পরিবর্তন শনাক্ত করা গেলে মধ্যবয়সেই চিন্তাশক্তির অবনতির ঝুঁকিতে থাকা নারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তন কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মেনোপজের সময় ব্যবহৃত হরমোন চিকিৎসা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় হরমোন চিকিৎসা গ্রহণকারী নারীদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যামাইলয়েডের পরিমাণ কম দেখা গেছে। তবে এ চিকিৎসা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।
এ ছাড়া হট ফ্ল্যাশ ও রাতের ঘাম কমানোর ওষুধ ফেজোলিনেট্যান্ট মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও চিন্তাশক্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তা পরীক্ষা করতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

গবেষকেরা বলছেন, মেনোপজ নারীর শরীরে স্বাভাবিক ও জটিল পরিবর্তনের একটি পর্যায়। মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া অধিকাংশ নারীই আলঝেইমারে আক্রান্ত হন না। তাই এ সময়ের শারীরিক ও হরমোনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে কারা ভবিষ্যতে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন এবং কারা তুলনামূলক সুরক্ষিত থাকবেন, তা শনাক্ত করাই এখন গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।