বিয়ের পর সন্তান না হলে অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলে সন্তান ধারণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ও সামাজিক চাপ বাড়ে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর গুণগত মান কমতে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ডিম্বাণুতে বয়সের প্রভাব নিয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে রক্ত ও লালারসের কোষে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএতে মিউটেশন বা জিনগত পরিবর্তন বাড়লেও ডিম্বাণুতে তা বাড়ে না।
গবেষকদের মতে, বয়স বাড়ার পরও ডিম্বাণু নির্দিষ্ট ধরনের জিনগত পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
গবেষণায় ২০ থেকে ৪২ বছর বয়সী ২২ জন নারীর ডিম্বাণু, রক্ত ও লালারসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। উন্নত জিনগত বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে এসব নমুনার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ পরীক্ষা করেন গবেষকেরা।

এতে দেখা যায়, ডিম্বাণুতে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর মিউটেশনের হার বয়সের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বিপরীতে, রক্তে মিউটেশনের হার বেড়েছে এবং লালারসেও বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর নিজস্ব ডিএনএ রয়েছে। এই ডিএনএতে কিছু জিনগত পরিবর্তন রোগের কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর ডিম্বাণুতে রক্ত ও লালারসের তুলনায় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর মিউটেশন ১৭ থেকে ২৪ গুণ কম। ডিম্বাণুতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কিছু পরিবর্তন তুলনামূলক কম থাকার পেছনে প্রাকৃতিক বাছাইপ্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।

তবে এই গবেষণার ফলকে নারীর বয়স বাড়লেও সন্তান ধারণের সক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকে—এমন প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণাটিতে মূলত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর নির্দিষ্ট ধরনের জিনগত পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়েছে। ডিম্বাণুর সামগ্রিক গুণগত মান, নিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিংবা সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি।
সাধারণভাবে নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে পারে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর এই পরিবর্তন প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন গবেষণাটি ডিম্বাণুর জিনগত পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও বয়সের সঙ্গে নারীর প্রজননক্ষমতার সামগ্রিক পরিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ধারণা পুরোপুরি বদলে দেয় না।
অন্যদিকে, পুরুষের বয়স বাড়ার সঙ্গেও প্রজননক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। বয়সের প্রভাবে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও জিনগত গুণগত মানে পরিবর্তন আসতে পারে।

কিছু গবেষণায় বেশি বয়সী বাবার সন্তানের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে এসব ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন এবং শুধু বাবার বয়সের ভিত্তিতে কোনো সন্তানের স্বাস্থ্যগত পরিণতি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
গবেষণাটি সন্তান ধারণে বয়সের প্রভাব সম্পর্কে আরও অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু নারীকে দায়ী করার সামাজিক প্রবণতা নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
বন্ধ্যত্বের কারণ নারী বা পুরুষ—যেকোনো একজনের প্রজননগত সমস্যা হতে পারে; আবার উভয়ের ক্ষেত্রেই সমস্যা থাকতে পারে। তাই সন্তান ধারণে সমস্যা হলে দুজনেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি।