যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়াই ব্রণের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয়েছে। এআই-চালিত হেলথটেক স্টার্টআপ নোলা হেলথ নিয়ন্ত্রক অনুমোদন (Regulatory Approval) পেয়ে সরাসরি ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যে এভাবে চিকিৎসকের ভূমিকা প্রতিস্থাপন করে এআইয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার অনুমতির ঘটনা এটিই প্রথম।
প্রাথমিকভাবে শুধু ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এ উদ্যোগ স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এআইয়ের সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও অসন্তোষের মধ্যেই এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নোলা হেলথের অ্যাপ ব্যবহার করতে প্রথমে রোগীকে নিজের মুখের ছবি স্ক্যান করতে হয়। এরপর চিকিৎসকের সরাসরি শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই নিজের চিকিৎসার ইতিহাস ও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয়। এআই সফটওয়্যারটি ত্বকের ছবি বিশ্লেষণ করে ব্রণের ধরন শনাক্ত করবে এবং ত্বক কতটা তৈলাক্ত, তা নির্ধারণ করে। পাশাপাশি ত্বকের অবস্থা অনুযায়ী একটি সংখ্যাভিত্তিক ‘ব্রণের তীব্রতা সূচক’ তৈরি করে। এ সূচকে ব্রণমুক্ত ত্বক থেকে শুরু করে গুরুতর ব্রণের বিভিন্ন মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

এআইয়ের তৈরি সূচকের সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে অ্যাপটি অনুমোদিত আটটি চিকিৎসাপদ্ধতির তালিকা থেকে উপযুক্ত ওষুধের সুপারিশ করবে। সাধারণত এসব ওষুধ ব্যবহারের আগে একজন চিকিৎসক রোগীর অবস্থা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন।
ইউটাহর এ পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের লক্ষ্য অঙ্গরাজ্যটিতে প্রতি বছর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা আনুমানিক সাড়ে ৫ হাজার থেকে ১১ হাজার ব্রণ আক্রান্ত রোগী। এ কার্যক্রমের আওতায় এআইয়ের তৈরি ব্যবস্থাপত্র সরাসরি যেকোনো ফার্মেসিতে পাঠানো যাবে। এর ফলে ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে লাইসেন্সধারী পেশাজীবীর বাধ্যবাধকতা-সংক্রান্ত প্রচলিত আইন থেকে সীমিত পরিসরে ছাড় পাওয়া যাবে।
৩ ধাপে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার কার্যক্রম
নোলা হেলথের কার্যক্রম তিনটি ধাপে পরিচালিত হবে। প্রথম ধাপে প্রথম ১০০ রোগীর জন্য এআইয়ের তৈরি ব্যবস্থাপত্র ফার্মেসিতে পাঠানোর আগে একজন চিকিৎসক পর্যালোচনা করবেন। পরবর্তী ৪০০ রোগীর ক্ষেত্রে এআই সরাসরি ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র পাঠাবে। পরে একজন চিকিৎসক প্রতি সপ্তাহে সেগুলো পর্যালোচনা করবেন। এরপর প্রতি মাসে দেওয়া ব্যবস্থাপত্রের অন্তত ১০ শতাংশ একজন চিকিৎসক পর্যালোচনা করবেন।

ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের বাণিজ্য বিভাগের অধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিবিষয়ক দপ্তর (ওএআইপি) নোলা হেলথের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম অনুমোদন করেছে। দপ্তরটি শিথিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এআইভিত্তিক পণ্য পরীক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছে।
নোলা হেলথের প্রধান নির্বাহী লুইস ভেনুস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এ ব্যবস্থায় ব্যবস্থাপত্রে একজন চিকিৎসকের নাম থাকবে, যদিও কোনো চিকিৎসক সরাসরি সেটি লিখবেন না। তার দাবি, অনুমোদিত ওষুধগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
নোলা হেলথ টিমের তথ্য অনুযায়ী, আটটি ওষুধের কয়েকটি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই কেনা যায়। এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ত্বকে স্থানীয়ভাবে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব ও শুষ্কতা। এছাড়া কার্যক্রমটি শুধু ত্বকে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। পিল বা হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এসব চিকিৎসায় তুলনামূলক নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

ভেনুস বলেন, ত্বকে প্রয়োগযোগ্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া বা চামড়া ওঠার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্যান্য অনেক ওষুধের তুলনায় এগুলোর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি অনেক কম।
কম খরচে চর্মরোগের চিকিৎসার লক্ষ্য
যুক্তরাষ্ট্রে চর্মরোগের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করাই ভেনুসের উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানটির অ্যাপ ব্যবহারে মাসে প্রায় পাঁচ ডলার খরচ হবে। আর বিশেষভাবে তৈরি ওষুধের (কম্পাউন্ডেড মেডিকেশন) জন্য মাসে ব্যয় হবে প্রায় ৫০ ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে সাধারণত একবার চিকিৎসা নিতে ১৫০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সে তুলনায় অ্যাপভিত্তিক সেবায় রোগীদের ব্যয় কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের চেম্বারে যাতায়াতের ঝামেলা ও দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ও কমানো সম্ভব হবে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

নোলা হেলথের মতে, সাধারণ রোগের চিকিৎসায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে চিকিৎসকেরা ত্বকের ক্যানসার ও জটিল প্রদাহজনিত রোগের মতো গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন।
ভেনুসের লক্ষ্য ভবিষ্যতে ব্রণের চিকিৎসার বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এআইনির্ভর ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবায় রূপ দেওয়া। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য হলো পরিবারের জন্য এআইচালিত একটি ‘সর্বাঙ্গীণ ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ তৈরি করা। ইউটাহর এ কার্যক্রম সেই লক্ষ্যের প্রথম ধাপ, যেখানে রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রায় প্রতিটি পর্যায় স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসকদের উদ্বেগ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক
এআই এজেন্টের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যে নোলা হেলথের এ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী জন হোয়াইট চিকিৎসাক্ষেত্রে এআইয়ের উপযুক্ত ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নেন।
এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এগুলোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিকিৎসা পরিচালনা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। যদি তা করে, তাহলে মানুষের মতোই এগুলোকে কঠোর মানদণ্ডের আওতায় আনতে হবে। আমার মনে হয় না, তারা সেই দায় পূরণ করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঐতিহাসিকভাবে ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষমতা চিকিৎসক এবং কিছু শ্রেণির নার্স প্র্যাকটিশনার ও চিকিৎসক সহকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে ইউটাহ অঙ্গরাজ্য নোলা হেলথের জন্য এমন একটি আইনি ছাড় দিয়েছে, যার ফলে ব্যবস্থাপত্রদাতাকে লাইসেন্সধারী চিকিৎসক হতে হবে—এমন বিধানটি এ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে শিথিল হয়েছে।
ইউটাহর এআই নীতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক জাকারি বয়েড বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে সীমিত পরিসরে এ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, ডকট্রনিক নামের আরেকটি স্টার্টআপকে এআইয়ের মাধ্যমে আগে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের ব্যবস্থাপত্র পুনরায় অনুমোদনের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয় একই দপ্তর। ওই কার্যক্রমে ব্যথানাশক ও বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধসহ বিভিন্ন ওষুধের পুনর্ব্যবস্থাপত্র অনুমোদনের সুযোগ ছিল।

কার্যক্রমটি শুরুর পর ইউটাহ মেডিকেল লাইসেন্সিং বোর্ড এক খোলা চিঠিতে জানায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। বোর্ডের ভাষ্য, এ উদ্যোগ “ইউটাহর নাগরিকদের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে”।
তবে এআই নীতিবিষয়ক দপ্তর কার্যক্রমটি বন্ধ না করে মেডিকেল লাইসেন্সিং বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার পর ডকট্রনিকের অনুমোদিত ওষুধের তালিকা থেকে দুটি ওষুধ বাদ দেয়।
এআইয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার আইনি কাঠামোয় কিছু অস্পষ্টতা থাকলেও কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য বিশেষ ধরনের পেশাগত দায়বদ্ধতা বিমা বাধ্যতামূলক করেছে। বয়েড জানান, এ বিমার আওতায় এআইয়ের তৈরি ব্যবস্থাপত্রসংক্রান্ত দায়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হয়।
নোলা হেলথের ক্ষেত্রে রোগীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণে চুক্তিতে বিশেষ ‘যত্নের দায়িত্ব’ (ডিউটি অব কেয়ার) সংক্রান্ত শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের শর্ত এআইয়ের দেওয়া ব্যবস্থাপত্রের কারণে কোনো বিরোধ বা ক্ষতির ঘটনা ঘটলে আদালতকে দায় নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।

বয়েডের ধারণা, ডকট্রনিকের কার্যক্রম নিয়ে যে ধরনের বিতর্ক হয়েছিল, নোলা হেলথের ক্ষেত্রে তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ, নোলা হেলথের কার্যক্রম শুধু ব্রণের ওষুধে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া অনুমোদন পাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি ইউটাহ মেডিকেল লাইসেন্সিং বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছে। সেই আলোচনার ভিত্তিতে কার্যক্রমে পরিবর্তন এনে ব্যবস্থাপত্র পর্যালোচনার তদারকির জন্য মেডিকেল বোর্ডের মনোনীত একজন তৃতীয় পক্ষের চিকিৎসককে যুক্ত করা হয়েছে।
নোলা হেলথের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এক বছর চলবে। পরে ইউটাহর এআই নীতিবিষয়ক দপ্তরের বিবেচনায় এটি আরও দুই বছর পর্যন্ত নবায়ন করা যেতে পারে।