রোগীদের অনেকে তাঁকে ডাকেন ‘ঈশ্বর’ বলে। তাঁর হাতে অস্ত্রোপচারের পর নতুন জীবন পেয়েছে অসংখ্য শিশু। জটিল হৃদ্রোগে আক্রান্ত যেসব শিশুকে অন্য হাসপাতালগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি, তাদেরও চিকিৎসা করেছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা হৃদ্শল্যচিকিৎসক আসিফ হাসানের কর্মজীবনের এমন অসংখ্য গল্প রয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার আগে তাঁর চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া ১৯ রোগী এক মঞ্চে হাজির হয়ে তাঁকে সম্মান জানান। তাঁদের দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ৭০ বছর বয়সী এই চিকিৎসক।
যুক্তরাজ্যের ‘প্রাইড অব ব্রিটেন অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠানে আসিফ হাসানকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। এরপরই ছিল তাঁর জন্য বিশেষ চমক। তাঁর চিকিৎসায় জীবন ফিরে পাওয়া শিশু ও তরুণেরা একে একে মঞ্চে দাঁড়ান। তাঁদের কেউ শৈশবে জটিল হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন, কেউ পেয়েছেন নতুন হৃদ্যন্ত্র। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী ইসাবেল আমোসের বয়স ১০ বছর, আর সবচেয়ে বেশি বয়সী লরা ম্যাসনের ৪৩ বছর।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর- এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোগীদের বক্তব্য শুনে মঞ্চে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে আসিফ হাসানের। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমার বলার মতো কোনো কথা নেই। আপনারা বাস্তব মানুষের এত অভিজ্ঞতার কথা শুনলেন! অথচ আমি শুধু আমার কাজটাই করেছি।
‘আমরা তাঁকে ঈশ্বর বলে ডাকতাম’
আসিফ হাসানের চিকিৎসায় ১১ বছর বয়সে হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপন করিয়েছিলেন সিসিলিয়া আদামু। বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী সিসিলিয়া আসিফ হাসানকে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, এমন একজন চিকিৎসকের অবদান বর্ণনা করার মতো যথেষ্ট শব্দ নেই।
সিসিলিয়া বলেন, হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের মতো অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতা যাঁদের নেই, তাঁদের পক্ষে এর গুরুত্ব বোঝা কঠিন। অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন চিকিৎসকের শান্ত ও আশ্বস্ত করার মতো আচরণ তাঁর পরিবারের জন্য বড় ভরসা ছিল।

সিসিলিয়া বলেন, ‘আমরা সবাইকে আলাদা নামে ডাকতাম। প্রতিস্থাপন-সংক্রান্ত নার্সদের ডাকতাম ডেবি ডু ও ট্রান্সপ্লান্ট টেরি, আর চিকিৎসক রিচার্ড কার্ক ছিলেন ক্যাপ্টেন কার্ক। আসিফকে ডাকতাম ঈশ্বর বলে। আমরা ধর্মপ্রাণ পরিবার নই, তবু তাঁর উপস্থিতি আমাদের কাছে এমনই মনে হতো।’
তিনি আরও বলেন, শিশুদের জীবন বাঁচানোই যেন আসিফের জীবনের উদ্দেশ্য। তাঁর হাতে জীবন ফিরে পাওয়া শিশুরা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করে।
চার হাজারের বেশি অস্ত্রোপচার
নিউক্যাসল আপন টাইন শহরের ফ্রিম্যান হাসপাতালে ৩৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন আসিফ হাসান। এ সময়ে তিনি ৪ হাজারের বেশি ওপেন-হার্ট অস্ত্রোপচার করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার অস্ত্রোপচারে প্রধান সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জরুরি অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা এর বাইরেও রয়েছে।

শিশুদের হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের আগে দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখার জন্য যান্ত্রিক হৃদ্সহায়ক ব্যবস্থা ব্যবহারের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। এ ব্যবস্থায় দাতার উপযুক্ত হৃদ্যন্ত্র পাওয়া পর্যন্ত গুরুতর অসুস্থ শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়।
এছাড়া শিশুর বুকের তুলনায় বড় দাতার হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের পর অস্ত্রোপচারের জায়গা বন্ধ করতে বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন তিনি। ‘বুটলেস ক্লোজার’ নামে পরিচিত এ পদ্ধতির ফলে এমন কিছু শিশুর হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার করা কঠিন ছিল।
আসিফ হাসান শুধু যুক্তরাজ্যেই চিকিৎসাসেবা দেননি। ছুটিতে স্ত্রী ন্যান্সিকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে গিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং শিশুদের জটিল হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তাঁর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা কাজ করছেন।
অস্ত্রোপচারের সময়ও ছিলেন শান্ত
আসিফ হাসানের চিকিৎসায় হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল ম্যাক্স জনসনেরও। অস্ত্রোপচারের সময় একটি ধমনি কেটে রক্তপাত শুরু হলেও চিকিৎসক শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামাল দেন। ঘটনাটি ২০১৮ সালে বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র ‘হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট: আ চান্স টু লিভ’-এ উঠে আসে।

ম্যাক্সের মা এমা জনসন বলেন, আসিফ হাসান তাঁর দেখা অসাধারণ মানুষদের একজন। নিজের ছেলের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি তিনি দাতার হৃদ্যন্ত্রের প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছেন, তা তাঁদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
ম্যাক্সের হৃদ্যন্ত্রে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল কিরা বলের দান করা হৃদ্যন্ত্র। কিরার বাবা-মা সড়ক দুর্ঘটনায় মেয়ের মৃত্যুর পর তাঁর অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নেন। কিরার দান করা অঙ্গের মাধ্যমে চারজনের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।
ম্যাক্স ও সিসিলিয়া অঙ্গদানের আইন পরিবর্তনের প্রচারেও যুক্ত ছিলেন। তাঁদের উদ্যোগে পরিচালিত ‘চেঞ্জ দ্য ল ফর লাইফ’ প্রচারণার পর ২০২০ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সম্মতিভিত্তিক নতুন আইন চালু হয়। ম্যাক্স ও কিরার নাম অনুসারে আইনটির সঙ্গে তাঁদের গল্পও জড়িয়ে আছে।
‘সবচেয়ে বড় অর্জন- নিজের চেয়ে ভালো চিকিৎসক তৈরি করা’
দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসিফ হাসান বলেন, শিশুদের সুস্থ হয়ে পরিপূর্ণ ও আনন্দময় জীবনযাপন করতে দেখা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তবে কর্মজীবনে রোগীদের হারানোর বেদনাও তাঁকে বহন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু আমার সঙ্গে অসাধারণ সব সহকর্মী ছিলেন, যাঁরা রোগীদের জন্য নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। শুধু জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা নন, নার্সরাও ছিলেন অসাধারণ। আমি বিশ্বের অন্যতম অসাধারণ প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।’

নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, অবসরে যাওয়ার সময় তাঁর জায়গায় যেন দক্ষ চিকিৎসকের অভাব না হয়, সেটিই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি এমন চিকিৎসক তৈরি করতে চেয়েছেন, যাঁরা শুধু দক্ষই হবেন না, বরং তাঁর চেয়েও ভালো চিকিৎসা দিতে পারবেন।
আসিফ হাসানের ভাষায়, ‘শিশুদের সুস্থ হয়ে পূর্ণ ও আনন্দময় জীবন কাটাতে দেখা সব সময়ই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এই দীর্ঘ যাত্রায় যুক্ত প্রত্যেক রোগী, পরিবার ও সহকর্মীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের প্রধান নির্বাহী স্যার জেমস ম্যাকি বলেন, আসিফ হাসান শিশু ও তাদের পরিবারের জীবন বদলে দিতে নিজের কর্মজীবন উৎসর্গ করেছেন। শিশুদের হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনে বিশ্বমানের সেবা গড়ে তোলা এবং অন্য চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া সম্মাননা আসিফ হাসানের কাছে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাঁর চিকিৎসায় জীবন ফিরে পাওয়া শিশুদের ভালোবাসায়।