কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য থাকায় একজন জুনিয়র মেকানিককে দিয়ে ফার্মেসির ওষুধ বিতরণের কাজ চালানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত এক মাসে অন্তত অর্ধশত রোগীকে কয়েক মাস আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিরাপত্তা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পিঠ ও পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে যান তানজিকা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সংগ্রহের পর তিনি দেখতে পান, এক্সিয়াম মাপস ২০-এর মেয়াদ গত জুনেই শেষ হয়েছে। বিষয়টি জানানোর পর তাকে নতুন মেয়াদের ওষুধ দেওয়া হয়।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বাইশগাঁও গ্রামের সাথী আক্তার। কোমরের ব্যথার জন্য নিয়মিত হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিতেন তিনি। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সেবনের পর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের ভুলের কারণে আমি তো মারাও যেতে পারতাম। এমন ওষুধ তারা আমাকে কেন দিল?
বিলকিস আক্তার নামে আরেক রোগী বলেন, বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় সরকারি হাসপাতালে আসেন গরিব মানুষ, কিন্তু ওষুধ না পেয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, পরে জানা যায় সেই ওষুধ হাসপাতালের স্টোরেই পড়ে মেয়াদ হারিয়েছে।

রোগীদের আরও অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। ফলে বিনামূল্যে ওষুধের আশায় আসা দরিদ্র রোগীদের বাইরে থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। অথচ কিছু ওষুধ হাসপাতালের স্টোরে পড়ে থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হচ্ছে।
সরকারিভাবে সরবরাহ করা এসব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ক্রয়-বিতরণ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা বাছাই করে তালিকাভুক্ত করার এবং রেজিস্ট্রারে কারণ লিপিবদ্ধ করার কথা।
তবে হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, স্টোর রেজিস্ট্রার ইচ্ছেমতো তৈরি করা হয় — ওষুধ আসার প্রকৃত পরিমাণ ও কাগজে লেখা পরিমাণে গরমিল থাকে, রোগীদের মধ্যে বিতরণেও একই অসংগতি দেখা যায়।

সূত্রের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের আগে অতিরিক্ত ওষুধ সরিয়ে রাখা হয় এবং রোগীদের মধ্যে বণ্টনেও অনিয়ম হয়, যার ফলে সময়ে সময়ে সরকারের লাখ লাখ টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হয়।
এদিকে, ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য থাকায় ফার্মেসির দায়িত্বে থাকা জুনিয়র মেকানিক নাসির উদ্দিন জানান, ২০১০ সালে তার নিয়োগ হয়। ২০১৬ সাল থেকে তাকে ফার্মেসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, স্টোর থেকে যাচাই করেই ওষুধ ফার্মেসিতে রাখা হয়। তবে ভুলবশত এক-দুই পাতা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার আবুল বাসারও স্টোরে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকার কথা অস্বীকার করলেও ভুলবশত এক-দুই পাতা থেকে যেতে পারে বলে স্বীকার করেন।

হাসপাতালের একটি সূত্রের দাবি, স্টোর ওষুধের প্রকৃত মজুত এবং রেজিস্টারে উল্লেখ করা পরিমাণে গরমিল রয়েছে। পরিদর্শনের আগে অতিরিক্ত ওষুধ সরিয়ে রাখা এবং বিতরণে অনিয়মের কারণে সরকারি অর্থে কেনা ওষুধ সময়মতো রোগীদের কাছে না পৌঁছে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী বলেন, স্টোর থেকে ওষুধ দেওয়ার আগে যাচাই করা হয়। তারপরও ভুল হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি ফার্মেসির সঙ্গে আলোচনা করে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির গাফিলতি রয়েছে কি না- তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর