জটিল কোনো অস্ত্রোপচারের আগে রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন রাখতে চিকিৎসকেরা সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহার করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সফল ব্যবহার দীর্ঘদিনের হলেও, অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ ঠিক কীভাবে মানুষের চেতনাকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়—সেই রহস্যের জট আজও পুরোপুরি খোলেনি। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই যুগেও অ্যানেস্থেশিয়ার নেপথ্যের মূল কার্যপ্রণালি বিজ্ঞানীদের কাছে অন্যতম বড় এক গবেষণার বিষয়।
অ্যানেস্থেশিয়ার প্রভাব ও মস্তিষ্কে পরিবর্তন
অ্যানেস্থেশিয়ার প্রভাবে একজন মানুষ কিছু সময়ের জন্য আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতনতা হারান। তখন তিনি কোনো ব্যথা অনুভব করেন না এবং পরে ওই সময়ের কোনো স্মৃতিও মস্তিষ্কে জমা থাকে না। ওষুধের প্রভাব কেটে গেলে আবার স্বাভাবিক চেতনা ফিরে আসে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন, মস্তিষ্কের ঠিক কোন পরিবর্তনের কারণে অ্যানেস্থেশিয়ার সময় চেতনা হারিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগের স্বাভাবিক ধরনটি বদলে দেয়। বিশেষ করে মস্তিষ্কের তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান কেন্দ্র ‘থ্যালামাস’ এবং ‘মস্তিষ্কের কর্টেক্স’-এর মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ এই সময়ে মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ আগের মতো সমন্বিতভাবে কোনো তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না
জটিল রহস্যের মুখোমুখি বিজ্ঞান

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, অ্যানেস্থেশিয়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রাসায়নিকভাবে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তা সত্ত্বেও প্রতিটি ওষুধই মানব মস্তিষ্কে একই ধরনের ফলাফল অর্থাৎ ‘চেতনা হারানো পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক উপাদান কীভাবে মস্তিষ্কে একই প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা বিজ্ঞানীদের কাছে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অ্যানেস্থেশিয়া ও স্বাভাবিক ঘুমের তফাত
অনেকেই অ্যানেস্থেশিয়াকে সাধারণ ঘুমের সঙ্গে তুলনা করেন, যা মোটেও ঠিক নয়। স্বাভাবিক ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কের কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলতে থাকে এবং প্রয়োজন হলে যেকোনো মুহূর্তে মানুষকে জাগিয়ে তোলা যায়। অন্যদিকে, অ্যানেস্থেশিয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সচেতন তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ও বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগ পুরোপুরি বদলে যায়। অ্যানেস্থেশিয়ার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের সার্বিক কার্যক্রমে পরিবর্তন দেখা যায়, যা ইইজি (EEG) পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করে এর গভীরতা বুঝতে পারেন।
চেতনার রহস্য ও বর্তমান তত্ত্ব
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—মানুষের ‘চেতনা’ আসলে কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে তা সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়?বিজ্ঞানীরা অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে চেতনাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে বন্ধ ও ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন, যা চেতনা বোঝার ক্ষেত্রে বড় একটি গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

অ্যানেস্থেশিয়া কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট রিসেপ্টর ও আয়ন চ্যানেলের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু গবেষক মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ ও তথ্যের সমন্বয়কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা কিছু জানতে পারলেও পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যানেস্থেশিয়ার সফল প্রয়োগ থাকলেও এর পেছনের চেতনার রহস্য আজও এক বিরাট প্রশ্ন।
সূত্র: সামা টিভি