
ছবি: সংগৃহীত
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে চার বছরের প্রেলং খুমি ও সাত বছরের খ্রেতং খুমিকে হারিয়েছেন বান্দরবানের রুমা উপজেলার লেংটংপাড়ার তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতি। হামের উপসর্গে দুই সন্তানকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই অসুস্থ আরও দুই সন্তানকে নিয়ে এখন বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে দিন কাটছে তাঁদের। ঘরবাড়ি ছেড়ে হাসপাতালই যেন এখন এই পাহাড়ি দম্পতির একমাত্র আশ্রয়।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সাত মাস বয়সী মেয়ে লিংথং এ খুমিকে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন মা নাংয়ো। পাশের শয্যায় চিকিৎসাধীন ১১ বছরের ছেলে পথাং এউং খুমির পাশে রয়েছেন বাবা তৈসাং।
বাংলা ভাষায় কথা বলতে না পারা নাংয়ো খুমি অশ্রুসিক্ত চোখে নিজের ভাষায় বলেন, তিনি বুঝতেই পারছেন না তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মৃতের মতো দিন কাটছে। আর তৈসাং খুমির কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস! কাতর কণ্ঠে তিনি বলেন, দুই সন্তানকে কবরে রেখে আরও দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। এখন হাসপাতালই আমাদের বাড়ি।
রুমা উপজেলার দুর্গম লেংটংপাড়ার এই পরিবারটি গত সপ্তাহে চার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে রওনা হয়েছিল। কিন্তু পথেই মারা যায় এক ছেলে। বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। পরদিন আবার হাসপাতালে আসার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আরেক সন্তান।
শুধু এই পরিবারই নয়, বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের প্রকোপে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে শুধু লেংটংপাড়াতেই হামের উপসর্গে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আশপাশের কয়েকটি পাড়াতেও আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২৯ জন রোগী রয়েছে। রোগীদের অধিকাংশই শিশু। সবাই প্রায় দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। চিম্বুক পাহাড়ের রুইয়াংপাড়ার পাঁচজন রোগী রয়েছে তাদের মধ্যে। ওই পাড়ার রিংইয়ং ম্রো জানান, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আড়াই বছরের তাইলেং ম্রোর অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। পাড়ায় আরও পাঁচ-ছয়জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত বলে রিংইয়ং ম্রো জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতি, বন্ধ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দুর্গম এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী শিশুদের নিরাপদ রাখতে নিয়মিত টিকাদান, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, হামের রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। চিকিৎসাধীন দুই শিশুর অবস্থাও বর্তমানে স্থিতিশীল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুসহ জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন