Ad
Advertisement
Doctor TV

মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬


স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ

Main Image

স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ


ডা. মো: আজিজুল হাকিম বাপ্পা 

 

প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় World Health Organization (WHO) ঘোষিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য 'Together for health: Stand with science'। বাংলা করা হয়েছে 'স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ'। স্লোগানটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি কেবল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের আহ্বান নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা, নীতি ও মানবিক সংহতির এক সম্মিলিত দর্শন।

 

মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক, সার্জারি, মহামারি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সবকিছুই বিজ্ঞানের অবদান। বিশেষ করে সাম্প্রতিক COVID-19 মহামারি আমাদের দেখিয়েছে, বিজ্ঞান ছাড়া মানবজাতি কতটা অসহায়। ভ্যাকসিন উদ্ভাবন, সংক্রমণ প্রতিরোধ, চিকিৎসা প্রোটোকল ইত্যাদি সবই বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। এই প্রেক্ষাপটে 'Stand with science' মানে হলো গুজব, অপচিকিৎসা, লোকবিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক (Evidence based) সিদ্ধান্ত গ্রহণ। চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। ‘Together’ অর্থাৎ সম্মিলিত উদ্যোগের অপরিহার্যতা মানে স্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক প্রচেষ্টার ফল নয়। এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। সরকার, চিকিৎসক ও সকল স্তরের সেবাপ্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ, মিডিয়া, সেলিব্রেটি সবাই এখানে অংশীজন। এই প্রতিপাদ্যের Together শব্দটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি মৌলিক অধিকার ও সামাজিক চুক্তি। একজনের অসচেতনতা পুরো সমাজকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। 

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। এবং এখানে স্বাস্থ্যের সামগ্রিক (holistic) বিবেচনাকেও সামনে আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'স্বাস্থ্য' এর সংজ্ঞা আমাদেরকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক সুস্থতার নির্দেশ করে। অথচ আমরা মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার কথা ভুলতে বসেছি। সমাজে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্থিরতা উৎপাদন করছি।

 

শুধু চিকিৎসক, প্রযুক্তি বা ওষুধ থাকলেই হবে না, প্রয়োজন জনমনে বৈজ্ঞানিক মনোভাব, সচেতনতা ও শিক্ষার বিস্তৃতি। আমাদের সমাজে এখনও ভ্রান্ত চিকিৎসা পদ্ধতি, গুজবভিত্তিক চিকিৎসা, টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা, ধর্ম বা সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে চিকিৎসা-বিরোধিতা এসব বিদ্যমান। ফলে Stand with science মানে শুধু বিজ্ঞানীদের সমর্থন নয়, বরং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। এবারের বাংলা প্রতিপাদ্যে 'সুরক্ষিত সকল প্রাণ' কথাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, বরং পরিবেশ, প্রাণীজগৎ ও বাস্তুতন্ত্র সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। আধুনিক জনস্বাস্থ্য ধারণায় 'One Health' পদ্ধতি মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করে। যেমন- জুনোটিক রোগ (প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়), জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্য নিরাপত্তা এসবই দেখায়, স্বাস্থ্য একটি আন্তঃসম্পর্কিত বাস্তবতা।

 

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রতিপাদ্য একটি কর্মপরিকল্পনার আহ্বান। স্বাস্থ্যখাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য খাতেও। প্রাথমিক জ্ঞান উৎপাদন করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া জরুরি। শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা (Health literacy) গড়ে তুলতে হবে। টেলিমেডিসিন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। 'স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ' এই প্রতিপাদ্য আমাদের একটি মৌলিক সত্যের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, বিজ্ঞান ও মানবতা একসঙ্গে চললে তবেই একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ সম্ভব। এটি কেবল একটি দিবসের স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থান। যেখানে বিজ্ঞান সত্যের পথপ্রদর্শক, মানবতা তার উদ্দেশ্য এবং সম্মিলিত উদ্যোগ তার শক্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো বিজ্ঞান।

 

লেখক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কবি ও চিন্তক

আরও পড়ুন