সবসময় ক্লান্ত লাগা, চুল পড়া কিংবা কোনো কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়াকে অনেকেই মানসিক চাপ, ব্যস্ত জীবনযাপন, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব বা দৈনন্দিন নানা দায়িত্বের স্বাভাবিক ফল বলে মনে করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা শরীরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির কারণেও হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ ধরনের ঘাটতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেলেও এর উপসর্গ অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে উপেক্ষা করা হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, নারীদের মধ্যে আয়রন, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি বেশ সাধারণ।
আয়রনের ঘাটতি
আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতা এখনো নারীদের জন্য বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিশোরীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুতর। বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য বেশি আয়রন প্রয়োজন হয়। একই সময়ে মাসিকের কারণে প্রতি মাসেই শরীর থেকে আয়রন কমে যায়। ফলে পর্যাপ্ত আয়রন না পেলে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী জীবনেও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি
সূর্যালোকপ্রধান দেশে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। তবে আধুনিক জীবনযাপনই এর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে থাকা, সূর্যের আলো থেকে শরীর ঢেকে রাখা এবং ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়ার কারণে এই ঘাটতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বাইরে প্রচুর সূর্যালোক থাকলেও বাস্তবে অনেক মানুষ পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাচ্ছেন না।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিও ব্যাপক হলেও বিষয়টি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। এর অন্যতম কারণ খাদ্যাভ্যাস। ভিটামিন বি১২ মূলত প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়। নিয়মিত ফোর্টিফায়েড খাবার না থাকলে এ ঝুঁকি আরও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞের মতে, এসব পুষ্টি ঘাটতির উপসর্গ সাধারণ জীবনের নানা সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। ক্লান্তিকে ব্যস্ততার ফল, চুল পড়াকে পানির মান বা শ্যাম্পারের সমস্যা এবং মনোযোগের ঘাটতিকে মানসিক চাপ বলে মনে করা হয়। ফলে প্রকৃত কারণ শনাক্ত হতে দেরি হয়।

পুষ্টি শোষণ বাড়াতে যা করবেন
শুধু সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি শরীর যাতে পুষ্টি উপাদান ভালোভাবে শোষণ করতে পারে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
আয়রনের ক্ষেত্রে: আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে লেবু বা আমলার মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রন শোষণ বাড়তে পারে। খাবারের সঙ্গে চা বা কফি না খাওয়াই ভালো, কারণ এতে থাকা ট্যানিন আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। ডাল ও বিভিন্ন শস্যজাতীয় খাবার ভিজিয়ে বা অঙ্কুরিত করে খেলে আয়রনের সহজলভ্যতা বাড়তে পারে। থাইরয়েডের ওষুধ সেবন করলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ভিটামিন ডি-এর ক্ষেত্রে: ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খালি পেটে না নিয়ে কিছুটা চর্বিযুক্ত খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করলে শোষণে সহায়তা করতে পারে। বাদাম, বীজ ও শাকসবজির মতো ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক নেওয়া জরুরি হলেও শুধু সূর্যালোকের ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভিটামিন বি১২-এর ক্ষেত্রে: নিয়মিতভাবে বি১২-এর প্রয়োজন পূরণের পরিকল্পনা থাকা দরকার। দুধ ও ডিম থেকে বি১২ পেতে পারেন। শুধু স্পিরুলিনার মতো উদ্ভিদভিত্তিক উৎসের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, কারণ এতে থাকা বি১২-এর কিছু ধরন শরীর কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন মেটফরমিন বা অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা পরীক্ষা করানো যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, চুল পড়া বা মনোযোগের সমস্যাকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।