wcm
Back to home

৩০ বছরের অপেক্ষা; ৫২ বছরে এমবিবিএস পাস

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষের কে-৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন হাবিবুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী ২০০১ সালেই তাঁর এমবিবিএস শেষ করার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হলো ২০২৬ সালে।

ডেস্ক রিপোর্ট

September 7, 2026

৩০ বছরের অপেক্ষা; ৫২ বছরে এমবিবিএস পাস
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হলের করিডর। ফল প্রকাশের পর চারপাশে স্বাভাবিক ব্যস্ততা। এর মধ্যেই মোবাইল ফোনে চোখ আটকে গেল মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর। ফলাফলে নিজের নামটি দেখলেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত যেন কিছুই বলতে পারলেন না।

হল অফিসের স্টাফ মো. তারেক ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ভাই, আপনি তো পাস করে ফেলেছেন।’

হাবিবুল্লাহ তখনও নির্বাক। চোখের কোণে পানি।

হবেই বা না কেন? এই একটি মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছেন প্রায় তিন দশক। যে বয়সে অনেকেই কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যান, সেই ৫২ বছর বয়সে এসে নামের পাশে ‘ডা.’ পদবি যুক্ত হলো তাঁর।

এটি শুধু একটি এমবিবিএস সনদ নয়। এটি তাঁর কাছে ফিরে পাওয়া একটি জীবন, পূরণ হওয়া একটি স্বপ্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে বয়ে চলা এক অসমাপ্ত গল্পের সমাপ্তি।

মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালককে ওএসডি করায় এনডিএফের নিন্দা
আরও পড়ুন মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালককে ওএসডি করায় এনডিএফের নিন্দা

যে গল্পের শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০১ সালে

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষের কে-৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন হাবিবুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী ২০০১ সালেই তাঁর এমবিবিএস শেষ করার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হলো ২০২৬ সালে।

মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় ২৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে জীবন তাঁকে একের পর এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে। পড়াশোনায় ছেদ পড়েছে, এসেছে পারিবারিক শোক, মানসিক সংকট ও অনিশ্চয়তা। একসময় মনে হয়েছিল, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন হয়তো আর পূরণ হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অসমাপ্ত পথেই ফিরেছেন তিনি।

চোখে ইনজেকশনের পর শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ, অপটোমেট্রিস্ট পুলিশের হেফাজতে
আরও পড়ুন চোখে ইনজেকশনের পর শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ, অপটোমেট্রিস্ট পুলিশের হেফাজতে

মেধার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই

হাবিবুল্লাহর বাবা ডা. আবু বকর মোহাম্মদ সিদ্দিক ছিলেন কিশোরগঞ্জের প্রথম এমবিবিএস চিকিৎসক। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব কেটেছে কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন হাবিবুল্লাহ। ১৯৯২ সালে রামানন্দ হাই স্কুল, বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম হন। অর্জন করেন রায় সাহেব মেমোরিয়াল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড।

এরপর ভর্তি হন নটর ডেম কলেজে। কিন্তু আবাসনসংকট, খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা ও প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে মাত্র তিন মাস পর তাঁকে কলেজ ছাড়তে হয়। গ্রামে ফিরে বাবাকে জানান, কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আবার পড়াশোনা করবেন।

উচ্চমাধ্যমিকের সময়ও পরীক্ষার আগে তীব্র উদ্বেগ ও ভয়ের মুখোমুখি হতেন তিনি। পরীক্ষার আগে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যেত, অসুস্থ হয়ে পড়তেন। অনেক পরীক্ষা অসুস্থ অবস্থায় শয্যায় থেকেই দিতে হয়েছে তাঁকে।

চিকিৎসকের বই (অধ্যয়ন), চিকিৎসকের চেয়ে রোগীকে অনেক বেশি উপকৃত করে
আরও পড়ুন চিকিৎসকের বই (অধ্যয়ন), চিকিৎসকের চেয়ে রোগীকে অনেক বেশি উপকৃত করে

স্বপ্ন ছিল সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়ার

১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন হাবিবুল্লাহ। শুরু থেকেই মনোরোগবিদ্যার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তৎকালীন মনোরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ এস মোহাম্মদ ফিরোজের হাত ধরে সাইকিয়াট্রিতে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে।

১৯৯৬ সালে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পত্রিকা ‘মনোজগত’-এর সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হবেন, পরে মনোরোগবিদ্যায় কাজ করবেন। কিন্তু মেডিকেলের পড়াশোনা যতটা স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছিল, একপর্যায়ে ততটাই বদলে যায় পরিস্থিতি।

মানবিক উদ্যোগে নিজের জটিলতা

১৯৯৮ সালের শেষদিকে প্রথম প্রফেশনাল এমবিবিএস পরীক্ষা দেওয়ার সময় ঢাকা মেডিকেলের এক অসুস্থ শিক্ষকের চিকিৎসার জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেন হাবিবুল্লাহ। শিক্ষক ও বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

স্বাস্থ্য ক্যাডারের ১৮৪ চিকিৎসকের যোগদান আগামীকাল
আরও পড়ুন স্বাস্থ্য ক্যাডারের ১৮৪ চিকিৎসকের যোগদান আগামীকাল

হাবিবুল্লাহর ভাষ্য, এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এরপর তিনি একাধিকবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তাঁর দাবি, এ সময় তিনি মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপ ও অপমানের মুখোমুখি হন। একপর্যায়ে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন তিনি।

এরপর প্রায় দুই দশক শিক্ষাজীবন থেকে দূরে ছিলেন হাবিবুল্লাহ। ২০০০ সালে মারা যান তাঁর বাবা। এর দুই বছর পর, ২০০২ সালে, কিডনি জটিলতায় মারা যান তাঁর স্ত্রী। একের পর এক ব্যক্তিগত শোক তাঁকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেয়।

যে মানুষটি নিজে মনোরোগ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকেই দীর্ঘ সময় নিজের মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।

জীবন চালাতে কিশোরগঞ্জে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন। কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটি বেঁচে ছিল।

ডাক্তার নিজেই অসুস্থ, স্যালাইন চলা অবস্থায়ই সেবা দিলেন রোগীদের
আরও পড়ুন ডাক্তার নিজেই অসুস্থ, স্যালাইন চলা অবস্থায়ই সেবা দিলেন রোগীদের

২৫ বছর পর নতুন করে শুরু

২০২২ সালে হাবিবুল্লাহ সিদ্ধান্ত নেন—এবার যেকোনো মূল্যে এমবিবিএস শেষ করবেন।

কিন্তু এত বছর পর আবার মেডিকেলে ফেরাও ছিল আরেক যুদ্ধ। প্রয়োজন ছিল ২৫ বছর আগের নথিপত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সিনিয়র অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম মামুন তাঁর পুরোনো ফাইল খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সহযোগিতা করেন।

এরপর একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভা হয়। ৭৮ জন সদস্যের সামনে নিজের জীবনের কথা তুলে ধরেন হাবিবুল্লাহ। তাঁর বক্তব্য শুনে কাউন্সিল তাঁকে আবার পড়াশোনার সুযোগ দেয়।

তবে শর্ত ছিল—প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে এবং এক বছর নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করতে হবে।

হাবিবুল্লাহ নিজে দেন এক লাখ টাকা। বাকি এক লাখ টাকা জোগাড়ে পাশে দাঁড়ান বন্ধু, শিক্ষক ও সহপাঠীরা।

অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসব, প্রসূতিদের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা
আরও পড়ুন অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসব, প্রসূতিদের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা

২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করেন হাবিবুল্লাহ। এরপর সার্জারি পরীক্ষায় প্রথমবারেই পাস করেন। পরে আবার বিরতি এলেও শেষ পর্যন্ত বাকি পরীক্ষাগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

নিজের চেয়ে প্রায় ২২ বছরের ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাস করা, ওয়ার্ডে কাজ করা—সবই ছিল কঠিন।

অবশেষে ২০২৬ সালে চূড়ান্ত পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হাবিবুল্লাহ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনায় ফিরে হাবিবুল্লাহর মধ্যে পাস করতে পারবেন কি না—এ নিয়ে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা ছিল। তাঁর জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

সব বাধা পেরিয়ে তাঁর সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়াকে প্রশংসনীয় বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রাজিবুর রহমানও হাবিবুল্লাহর লড়াইকে অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, মানুষ চাইলে যেকোনো বয়সে নতুন করে শুরু করতে পারে।

বাবার হাতে নির্যাতিত: ঢামেকে চিকিৎসাধীন ২ মাসের সেই শিশুর মৃত্যু
আরও পড়ুন বাবার হাতে নির্যাতিত: ঢামেকে চিকিৎসাধীন ২ মাসের সেই শিশুর মৃত্যু

সামনে আবারও সেই পুরোনো স্বপ্ন

কয়েক দিনের মধ্যেই এক বছরের ইন্টার্নশিপ শুরু করবেন হাবিবুল্লাহ। এরপর মনোরোগবিদ্যা বা সাইকিয়াট্রি নিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা করতে চান।

যে বয়সে অনেকের কাছে নতুন করে শুরু করার সময় পেরিয়ে যায়, সেই বয়সেই তিনি শুরু করছেন তাঁর চিকিৎসকজীবন।

হাবিবুল্লাহর গল্প তাই শুধু ৫২ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করার গল্প নয়। এটি থেমে যাওয়া একজন মানুষের আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি মনে করিয়ে দেয়।

Share
MICARE

আরও জানুন

ব্রেকিং শজিমেকে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
মেডিকেল ক্যাম্পাস

শজিমেকে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বৈঠক শেষে দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর ই মুর্শেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ডক্টর টিভি রিপোর্ট 3 Sep
ব্রেকিং শজিমেকে চিকিৎসকদের মারধর: ছাত্রদলের ৫ নেতা বহিষ্কার, গ্রেপ্তার ৬
মেডিকেল ক্যাম্পাস

শজিমেকে চিকিৎসকদের মারধর: ছাত্রদলের ৫ নেতা বহিষ্কার, গ্রেপ্তার ৬

চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

ডক্টর টিভি রিপোর্ট 3 Sep
ব্রেকিং শজিমেকে চিকিৎসকদের মারধর, দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে চলছে কর্মবিরতি
মেডিকেল ক্যাম্পাস

শজিমেকে চিকিৎসকদের মারধর, দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে চলছে কর্মবিরতি

আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা জানান, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রয়েছে।

ডক্টর টিভি রিপোর্ট 3 Sep
ব্রেকিং ঢামেকের উপাধ্যক্ষ হলেন অধ্যাপক মুসাররাত সুলতানা
মেডিকেল ক্যাম্পাস

ঢামেকের উপাধ্যক্ষ হলেন অধ্যাপক মুসাররাত সুলতানা

যোগদানের তারিখ থেকে এই নিয়োগের মেয়াদ হবে এক বছর। এ ছাড়া এই নিয়োগের অন্যান্য শর্ত চুক্তিপত্র দ্বারা নির্ধারিত হবে বলেও জনস্বার্থে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডক্টর টিভি রিপোর্ট 3 Sep