দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমাগত ভয়াবহ হচ্ছে। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ পরিস্থিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে টিকা আমদানির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজনে বেসরকারিভাবে টিকা আমদানির অনুমোদন দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
চলতি বছর এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২৯৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু চলতি অক্টোবরে মাসে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের মাস সেপ্টেম্বরে প্রাণহানি ঘটে ১৪৮ জনের। এর আগে, আগস্টে ৪৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ মারা যান।
অন্যদিকে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৯৭ হাজার ৮২ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি অক্টোবরে ১৭ হাজার ৪৬২ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগের মাস সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। এর আগে, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন এবং জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

বিগত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে করলে দেখা যায়, গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। চলতি অক্টোবর মাসের শেষ দিকে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতে টিকা আমদানির ওপর ই বিশেষ জোর দিচ্ছেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বর্তমানে পাওয়া একমাত্র টিকা কিউডেঙ্গা (টিএকে-০০৩)। সংস্থাটি উচ্চমাত্রার ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়—এমন এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের এ টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
ডব্লিউএইচওর টিকাদানবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক দল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই টিকার সুপারিশ করে। ২০২৪ সালের মে মাসে কিউডেঙ্গা ডব্লিউএইচওর প্রি-কোয়ালিফিকেশন পায়।

জাপানভিত্তিক তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি টিকাটি ভারতসহ ৪৩টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি ডোজ বিতরণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ২০ জুলাই ভারত কিউডেঙ্গা টিকার অনুমোদন দেয়। দেশটিতে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে বাণিজ্যিকভাবে টিকাটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে টিকার অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনই শুরুর তাগিদ
দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ডব্লিউএইচওর প্রি-কোয়ালিফায়েড কিউডেঙ্গা টিকা অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গুরুতর সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু কমাতে সরকার অন্তত বেসরকারিভাবে টিকা আমদানির সুযোগ দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার অনুমোদন ও সংগ্রহ করতে সময় লাগতে পারে। তাই সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে না পারলেও বেসরকারি আমদানির অনুমতি দিলে যাদের টিকা নেওয়া প্রয়োজন এবং আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা টিকা নিতে পারবেন। এতে হাসপাতালের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক রোবেদ আমিন জানান, যেসব দেশে বছরে ৫০ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়, সেসব এলাকাকে উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকা।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর দেশে এক লাখের মতো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং চলতি বছর এরই মধ্যে রোগীর সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। ওই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৭০০ জনের।
অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, বর্তমান কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টির দায়িত্ব নেওয়া এবং বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা আনার উদ্যোগ নেওয়া। তার মতে, টিকা শুধু রোগ প্রতিরোধের একটি উপায় নয়, এটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমানো গেলে গুরুতর রোগীর সংখ্যাও কমবে এবং এর ফলে মৃত্যুও কমবে—এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, কিউডেঙ্গা ৪০টির বেশি দেশে অনুমোদন পেয়েছে এবং ডব্লিউএইচওর প্রি-কোয়ালিফিকেশনও রয়েছে। তাই বাংলাদেশে টিকাটির সম্ভাব্য ঝুঁকি ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের কাজ দেরি না করে শুরু করা উচিত।
তিনি বলেন, টিকার বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ দেশের নিজস্ব কারিগরি কমিটির পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে সরকারকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।
বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, কিউডেঙ্গা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৮০ শতাংশের বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে এবং ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, টিকার দাম বেশি হওয়ায় সরকার সবার জন্য বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া কঠিন মনে করতে পারে। তবে বেসরকারি আমদানির অনুমতি দিলে যারা খরচ বহন করতে পারবেন, তাদের টিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকার মতো কিছু টিকা মানুষ ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিনে থাকেন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি রোগ নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ও ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. নাজিরুম মুবিন। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের পরিস্থিতিও তার প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, যদি হাসপাতালে রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে নতুন প্রতিরোধমূলক পদ্ধতিও যুক্ত করার সময় এসেছে। যে রোগে প্রতি বছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, সেখানে হাসপাতালে (ডেঙ্গু) রোগী কমানোর প্রমাণ থাকা একটি ভ্যাকসিনকে আমরা কেন গুরুত্ব দেব না?

ডা. নাজিরুম মুবিন জানান, কিউডেঙ্গা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুমোদিত হয়েছে। আর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতও কিউডেঙ্গাকে বাজারজাত করার অনুমোদন দিয়েছে।
তার মতে, ভারতের অনুমোদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের নিকট প্রতিবেশী এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় ডেঙ্গু প্রবণ দেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন শুধু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্যের দিকে তাকিয়ে নেই। প্রতিবেশী দেশের নিয়মতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব সম্মত প্রয়োগের দিকেও নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন বাংলাদেশের উচিত কিউডেঙ্গার অনুমোদনের বিষয়টি আর দীর্ঘসূত্রতায় না রেখে দ্রুত বৈজ্ঞানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রিভিউ সম্পন্ন করা।
দেশে ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদনে জোর দিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদন মানেই আগামীকাল থেকে দেশের সবাইকে টিকা দিতে হবে এমন নয়। প্রথম প্রয়োজন ভ্যাকসিনটিকে বাংলাদেশের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে মূল্যায়ন করে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু টিকা অনুমোদনের পথই বন্ধ থাকলে এসব প্রশ্নের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও থাকবে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যখন একটি কার্যকর বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার আমাদের সামনে এসেছে, তখন সেটিকে বাংলাদেশে অনুমোদনের সুযোগটুকু অন্তত দেওয়া উচিত।
বেসরকারিভাবে আমদানিতে অনুমতির আহ্বান
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফ উল্লাহ মুনশি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় সারা বছরই ডেঙ্গু মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে। ফলে এই মহুর্তে ডেঙ্গু মশার যে বিস্তৃতি তাতে খুব দ্রুতই সেটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক বলেন, এর একমাত্র সমাধান নিজের সুরক্ষা। এক্ষেত্রে ডেঙ্গু ভ্যাক্সিন হতে পারে কার্যকর সমাধান।
তিনি জানান, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ অনেক দেশ ই এখন কিউডেঙ্গাকে অনুমোদন দিয়েছে। বাংলাদেশেও সেটির প্রয়োগ করা যেতে পারে। সরকার ফান্ডিং সমস্যা দেখলেও ব্যাক্তিগত পর্যায়ে এই সুযোগ থাকা উচিৎ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও টিকাবিদ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, কিউডেঙ্গা ৪৩টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে অনুমোদন দেওয়ার পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকা আমদানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ডা. বারীর মতে, ডব্লিউএইচওর প্রি-কোয়ালিফিকেশন পাওয়া এবং অন্য দেশগুলোতে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে স্থানীয় পরীক্ষা ছাড়াই বেসরকারি আমদানির অনুমতি দেওয়া উচিত। স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা চালাতে আরও চার-পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, যা দেশের অবনতিশীল ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকা ব্যবহারের উদ্যোগকে বিলম্বিত করবে।

সরকারিভাবে না হলে বেসরকারিভাবে ডেঙ্গুর টিকা আনার সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গত ৪ অক্টোবর রাজধানীতে জামায়াত ইসলামী আয়োজিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দলটির আমির বলেন, সরকারিভাবে টিকা আনার যদি উদ্যোগ না থাকে, তাহলে বেসরকারিভাবে আনার রাস্তা খুলে দেন। এতে অন্তত মানুষ বাঁচার জন্য উপকরণ হাতে পাবে।
সরকারকে মানুষের জীবন রক্ষায় অতি দ্রুত মশা নিধনের বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও আক্রান্ত লোকদের সুষ্ঠু চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে কেউ অবহেলার শিকার না হয়।

দেশে টিকা আমদানির বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত গণমাধ্যমকে বলেন, টিকা পাওয়া গেলেও সেগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষাধীন প্রার্থী টিকা। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য সেগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা মূল্যায়ন করে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার।
তিনি আরও বলেন, এখন টিকার অনুমোদন দেওয়া হলেও চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। এ মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।