ছাত্রলীগ নেতার নামের সঙ্গে মিল থাকায় ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও বাদ পড়েছিলেন জুলাইযোদ্ধা ডা. নাহিদুর রহমান (নাহিদ)। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া এ ঘটনার পর পুনরায় ভেরিফিকেশনের আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি।
বর্তমান বিএনপি সরকারের শাসনামলে হওয়া পুনঃযাচাইয়ে এবার মায়ের জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কারণে বাদ পড়েছেন এই চিকিৎসক। এ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো সমাধান না মেলায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এই চিকিৎসক।
সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের (সিওমেক) ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের বিডিএস কোর্সের শিক্ষার্থী ডা. নাহিদ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য এফসিপিএস পার্ট-১ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেশিয়াল সার্জারি বিভাগে এমএস কোর্সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

২০২৫ সালের ১৮ জুলাই ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের (স্বাস্থ্য) লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। দুইদিন পর এর ফল প্রকাশ হলে ৫ হাজার ২০৬ জন প্রার্থী সাময়িকভাবে উত্তীর্ণ হন। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার ১২০ জন চিকিৎসককে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। এর মধ্যে ২৮২০ জন সহকারী সার্জন ও ৩০০ জন ছিলেন সহকারী ডেন্টাল সার্জন। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
চূড়ান্ত গেজেটে বাদ পড়া চিকিৎসকরা আবেদন করলে পুনরায় ভেরিফিকেশন করার পর ছাড়পত্র পাওয়া প্রার্থীদের মধ্য থেকে ১৮৪ জনকে গত ২৫ আগস্ট পুনরায় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
২২ জানুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত গেজেটে সিলেট ওসমানী মেডিকেলের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বাদ পড়েন। এর মধ্যে ডা. নাহিদ এবং তার সহপাঠী সিরাজুম মুনিরাকে নামের মিলের ভুলে কারণে বাদ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ডা. সিরাজুম মুনিরা নামে আরেক সিনিয়র শিক্ষার্থী যে যিনি ছাত্রলীগ সমর্থিত ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের (ইচিপ) কমিটিতে ছিলেন। পরে তারা আবেদন করলে সিরাজুম মুনিরাকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে, একই ব্যাচের ছাত্রলীগ নেতা ডা. নাহিদুল ইসলাম নাহিদের নামের সঙ্গে মিল থাকায় প্রথমবার বাদ পড়েন ডা. নাহিদুর রহমান (নাহিদ)। তিনি জানান, প্রথমবার পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ভেরিফিকেশন করে এমন ভুল রিপোর্ট দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি আবেদন করলে যাচাই করে সঠিক প্রতিবেদন জমা দেয় এসবি। তবে এরই মধ্যে পুনরায় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা-এনএসআকে ভেরিফিকেশনের জন্য নির্দেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, যার প্রতিবেদন জমা হয় চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে। এতেও বাদ পড়েন নাহিদ।

ডা. নাহিদ বলেন, ৪৮তম বিসিএসে যখন গেজেট হয়, তখন আমার নাম বাদ পড়ে। আমার নাম নাহিদুর রহমান (নাহিদ)। সিলেট মেডিকেলে আমারই আরেক ব্যাচমেট ছিল, তার নাম নাহিদুল ইসলাম নাহিদ। পুলিশ সামহাউ ওকে মনে করে আমাকে ছাত্রলীগ হিসেবে রিপোর্ট দিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, পরে আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব উজ্জ্বল স্যার (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জল হোসেন) মৌখিকভাবে বলেন যে আমার নামে এরকম রিপোর্ট আসছে। পরবর্তীতে সিলেট এসবি অফিসে অ্যাপ্লিকেশন দিলে তারা ফাইল ঘেঁটে দেখে যে, ছাত্রলীগ নেতার নাম নাহিদুল ইসলাম নাহিদ আর আমার নাম নাহিদুর রহমান, ব্রাকেটে নাহিদ। ওই সময় তারা গ্রস মিস্টেকটা বুঝতে পেরে একটা সম্পূরক রি-ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পাঠায়।

ডা. নাহিদ জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এনএসআইয়ের কাছে আবার তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। এনএসআই তদন্ত করে মার্চ-এপ্রিলে রিপোর্ট দেয়। এবার বাদ দেওয়ার পেছনে সম্ভবত শিবির সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সময়ে হলগুলোতে কেউ ছাত্রলীগের সাথে উঠতো, কেউ শিবিরের সাথে উঠতো। আমি শিবিরের সাথে উঠেছি, কারণ আমি ছাত্রলীগ বিরোধী ছিলাম। আমার আম্মা জামায়াতের সাথে আছেন। গত নির্বাচনেও এলাকায় জামায়াতের পক্ষে ভোট চেয়েছেন—হয়তো এটাই এনএসআইকে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভেরিফিকেশনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমার আব্বুকেও বলেছে যে ‘ওর আম্মা তো জামায়াত করে।’ এজন্যই আমরা মনে করছি জামায়াত-শিবির মতাদর্শের কারণেই আমাকে বাদ দিয়েছে।

ডা. নাহিদ বলেন, এনএসআই ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়ার পর আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নবনিয়োগ শাখার তৎকালীন যুগ্ম সচিবের সাথে দেখা করি। তিনি আমাকে বললেন যে—‘আপনার রিপোর্টে কিছু সমস্যা আছে, আমরা দেখি।’ তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব সাবিহা ম্যাডামের (সাবিহা ফাতেমাতুজ-জোহরা) সাথে কথা বলতে বলেন। কিন্তু সাবিহা ম্যাডাম বললেন, ‘আমি জুনিয়র অফিসার, কিছু বলতে পারব না; সিনিয়র লেভেলে যোগাযোগ করেন অথবা অপেক্ষা করেন, দেখেন কী হয়।’

তখন থেকে অপেক্ষা করছেন জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, আমি সবার কাছে ছোটাছুটি করছি, একেক জায়গায় যাচ্ছি। সচিবালয়ে যারা আছে তারা তো কোনোভাবে কথা শুনতে চায় না। ফাইল চাপা দিয়া রেখেছে। আমি জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহতদের চিকিৎসায় যুক্ত ছিলাম। একইসাথে রাজপথেও ছিলাম আমি। কিন্তু আমার ন্যায্য অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।