বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্ণতার (ডিপ্রেশন) প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নানা কারণে মানুষ হতাশ হলেও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী বা বয়স্কদের তুলনায় যুবক-যুবতীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। তীব্র মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেন।
মানসিক স্বাস্থ্য ও মানব আচরণ বিষয়ক মার্কিন সাময়িকী ‘সাইকোলজি টুডে’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার সামগ্রিক হার কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি বাড়ছে। দেশটিতে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৪.১২ জন আত্মহত্যা করছেন, যা ১৯৯৯ সালের পর থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। মার্কিন সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৬৪ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এছাড়া শহরের চেয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে আত্মহত্যার হার লক্ষণীয়ভাবে বেশি।
বিষণ্ণতা যেভাবে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে
অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা কোনো না কোনো মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষণ্ণতা যত তীব্র হয়, আত্মহত্যার ঝুঁকিও তত বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫ শতাংশের মনে আত্মহত্যার চিন্তা বা ‘সুইসাইডাল আইডিয়াশন’ আসে। সাধারণ মানুষের জীবনে কঠিন সময়ে আত্মহত্যার ভাবনা এলেও তারা প্রিয়জনদের কথা ভেবে তা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু বিষণ্ণতা মানুষের চিন্তাভাবনার স্বাভাবিক নমনীয়তা নষ্ট করে দেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পান না এবং ভবিষ্যতে ভালো কিছু হওয়ার আশাও হারিয়ে ফেলেন। এটি অতীতের ব্যর্থতা, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা, বিচ্ছেদ এবং শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোকে বারবার সামনে এনে মনকে সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে।
আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার হার কত?
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগে বিষণ্নতার চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যা করেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার ৪ শতাংশ। আর আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টার কারণে যারা হাসপাতালে ভর্তি হন, তাদের মধ্যে ৬ শতাংশ শেষ পর্যন্ত জীবন শেষ করে দেন। অথচ আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের প্রায় ৬০ শতাংশেরই এমন মানসিক ব্যাধি থাকে, যা সঠিক চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। এছাড়া তরুণদের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি, চাকরি হারানো বা সম্পর্কের বিচ্ছেদ আত্মহত্যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
প্রত্যাখ্যানের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা
গবেষকদের মতে, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বন্ধুর নীরবতা বা সামাজিকভাবে একঘরে হওয়ার মতো প্রত্যাখ্যানগুলো তরুণদের সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক যন্ত্রণার সময় মস্তিষ্কের যে অংশগুলো সক্রিয় থাকে, প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি হলেও ঠিক একই অংশগুলো সক্রিয় হয়। কিন্তু শারীরিক ব্যথার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণা বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটি স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে এবং প্রতিবারই তীব্র কষ্ট দেয়।
ঝুঁকি বোঝার উপায় ও করণীয়
কাছের মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে কি না তা বোঝার স্পষ্ট লক্ষণ হলো তার মুখে মৃত্যুর কথা শোনা। প্রচণ্ড হতাশায় থাকা মানুষরা প্রায়ই বলেন যে—তাদের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, তারা নিজেদের আটকে পড়া মনে করছেন বা অন্যদের ওপর বোঝা হয়ে উঠছেন। আচরণগত লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ইন্টারনেটে আত্মহত্যার উপায় খোঁজা বা প্রিয় জিনিস অন্যকে দিয়ে দেওয়া। অনেকে মনে করেন সরাসরি আত্মহত্যার কথা জিজ্ঞাসা করলে তার মাথায় এই চিন্তা ঢুকে যেতে পারে—যা সম্পূর্ণ ভুল। বরং সহানুভূতির সাথে সরাসরি জানতে চাইলে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বস্তি পান। এমন লক্ষণ দেখলে দ্রুত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।