জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোসরদের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার পক্ষে নীরবে নিভৃতে লড়াই করে গেছেন একদল চিকিৎসক। আন্দোলনে আহত হওয়া হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন এসব নিভৃতচারী নায়ক। এজন্য তাদেরকে হুমকি, বদলি ও পদাবনতিসহ চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের এমন ই এক নিভৃতচারী নায়ক হলেন মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও স্পাইন সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন। অভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সে সময় ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ায় সে বছরের ২৮ জুলাই তাঁকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আদেশটি বাতিল করে।
এরপর চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়; যেখানে তাঁর বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ নেই।

তখন ডা. শহীদুল ইসলাম আকনের বদলির আদেশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে ‘যে কোনো মূল্য’ তাকে ঢাকা মেডিকেলে রাখার দাবি জানান।
তারা জানান, ডা. শহীদুল অনেক শিক্ষার্থী বান্ধব ছিলেন। শিক্ষার্থীদের যে কোনো সমস্যায় তিনি খুব দ্রুত সাড়া দিতেন। এ রকম একটি মানুষকে এভাবে ‘অপমানজনক’ বদলি করা হলে কেউ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সাহস পাবে না।
তবে ডা. শহিদুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে জানান, বদলি বা হয়রানি নিয়ে তাঁকে কখনো কোনো আক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। বরং এতো কিছুর পরও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে নিভৃতে মানবতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চলতি বছরের ১১ জুলাই আয়োজিত অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করেন চিকিৎসকরা।

গণঅভ্যুত্থানের সময় আহতদের চিকিৎসাসেবায় সরাসরি যুক্ত থাকা চিকিৎসকরা ভয়াবহ সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ সময় উঠে আসে ফ্যাসিবাদী সরকারের কারফিউ, সংঘাত, গুলিবর্ষণ ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে আহতদের সেবা দেওয়ার স্মৃতি।
সেদিনে স্মৃতিচারণে ডা. শহিদুল ইসলাম আকন বলেন, ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। শুরুতে ছররা গুলিতে আহত রোগী বেশি এলেও ১৮ জুলাই বিকেল থেকে সরাসরি গুলিবিদ্ধ রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে মৃত্যুর ঘটনাও। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা মেডিকেলের নিয়মিত ও পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখে সব অপারেশন থিয়েটার (ওটি) শুধু আন্দোলনে আহতদের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহার করা হয়।

তিনি জানান, চিকিৎসা দিতে সরাসরি বাধা না এলেও পরোক্ষ চাপ ছিল। ২৩ জুলাই তৎকালীন সরকারের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হাসপাতালে এসে আহতদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ ও ‘সরকার পতনের আন্দোলনকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলা হলেও অতিরিক্ত সহানুভূতি বা আগ্রহ না দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসায় নিবেদিত প্রাণ এই চিকিৎসক বলেন, আন্দোলনের সময় আহতদের পাশে দাঁড়ানো এবং চিকিৎসাকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবারের ব্যবস্থা করাকেও পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহতদের পক্ষে মতপ্রকাশ করা নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।

ডা. শহিদুল আরও জানান, আহতদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে ২৫ জুলাই তাকে স্পাইন সার্জারি বিভাগ থেকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে বদলি করা হয়। একইভাবে আরও কয়েকজন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল।
তার মতে, এসব বদলির উদ্দেশ্য ছিল অন্য চিকিৎসকদের জন্য একটি বার্তা দেওয়া, যেন কেউ আন্দোলনের আহতদের বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ না দেখান।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ ডা. শহীদুল ইসলাম আকনকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আজ এক হার না মানা জীবন্ত কিংবদন্তির গল্প আমি আপনাদেরকে শোনাতে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা জানাতে চাই।
ডাকসুর এই নেতা লেখেন, ২৪ এ লীগ যখন ছাত্র-জনতার উপরে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম গণহত্যা পরিচালনা করছিলো। তখন লীগ ও পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ বা লীগের রামদার কোপে রক্তাক্ত এরকম শতশত মুমূর্ষু বিপ্লবীদের ঢল নামে ঢাকা মেডিকেলে।

অনেক ডাক্তারই পুলিশি ভয়কে উপেক্ষা করে যথাযথ চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু এইখানে অনন্য ছিলেন অনেক বীর। এমনই এক বীরের গল্প আমি আপনাদের শোনাতে চাই। যিনি সকল ভয়কে মাড়িয়ে নিজ জীবনকে বিপন্ন করে, উজার করে দিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা দেন। চিকিৎসা সহায়তায় জন্য চিকিৎসক বন্ধুদের সাথে নিয়ে গঠন করেন ফান্ড। সহায়তা করেন অসংখ্য মুমূর্ষু আহত বীরদের।
ফ্যাসিস্ট লীগ এই চিকিৎসককে পুরস্কৃত করার পরিবর্তে শাস্তি দেয়। যাতে ঢামেকে আহত বীররা যথাযথ চিকিৎসা না পায় এবং "আন্দোলনে আহতদের যেসব চিকিৎসক সেবা দিয়েছেন, তারা ঢাকা মেডিকেল থাকার যোগ্য নন" এই কথা বলে ২৩ জুলাই,২৪ আমাদের এই হিরো ডাক্তারসহ মোট ৫ জনকে শাস্তিমূলকভাবে সুনামগঞ্জ বদলি করে দেয়।
ফেসবুক পোস্টে মুসাদ্দিক আরও লেখেন, বলছিলাম নির্ভীক জুলাই হিরো অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন ভাইর কথা। জুলাইয়ের পর উনি কোনো সুবিধা গ্রহণ করেননি। শূন্য হাতে নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে এসেছেন। বরং তাঁকে বর্তমান সরকার অবমূল্যায়ন করে পদাবনতি দিয়েছে। তবুও এই নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ আমি কখনো দেখিনি। বরং বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মানবতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

এরকম নির্মোহ একজন মানুষের গল্প আজ হঠাৎ করে বলার ভিন্ন একটি কারণ আছে। গত কয়েকদিন আগে আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিলো। পরীক্ষার হলে ঢুকব এমন সময় হঠাৎ আমাকে একটা মেসেজ দিয়ে উনি একটা ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জানাতে বলেন। পরীক্ষা ও ডাকসুর শেষ মুহুর্তে ঘোষণাটি গুছিয়ে উঠতে পারিনি তাই আজ বলছি।
ডাকসুর এই সম্পাদক জানান, তাঁর (ডা. শহীদুল) মেসেজটি হচ্ছে— "আমি ঘোষনা দিচ্ছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত 'বর্তমান সকল শিক্ষার্থীদের' জন্য আমার প্রাইভেট চেম্বারে ভিজিটিং ফি ফ্রি করে দিবো, ইনশাআল্লাহ। 'আমার সাবজেক্ট স্পাইন সার্জারী (মেরুদণ্ড বিশেষজ্ঞ) ।' এই সাবজেক্টের রোগের জন্য তারা চেম্বারে সিরিয়াল দিয়ে এসে শুধু পরিচয় দিবেন। বাকিটা আমার দায়িত্ব। ডাকসুর সৌজন্যে এটা আমি করবো, ইনশা আল্লাহ।"

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা মুসাদ্দিক তার ফেসবুক পোস্টে ডা. শহীদুলের প্রসঙ্গে বলেন, ঢাবি শিক্ষার্থীদের জন্য ওনার এই ভালোবাসা দেখে আমি আপ্লূত হয়েছি। ঢাবির অসংখ্য শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়ে বিপাকে পরে আমাকে জানালে আমি ওনার সাথে কথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই অধিকাংশ সমস্যা সমাধান হয়ে গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। আমার মাধ্যমে যারা মেডিকেল সেবা পেয়েছেন গত একবছরে তার উল্লেখযোগ্য অংশেই উনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমি ওনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আল্লাহ নিশ্চয়ই ওনাকে উত্তম পুরুস্কার দিবেন।