দেশের সকল জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা চালু করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। সে লক্ষ্যে পাঁচ হাজার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে তিন মাসের ডায়ালাইসিস বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করা হয়েছে। এছাড়া নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট উভয় ক্যাটাগরিতেই দুই হাজার ৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ১২০ জনকে নিয়ে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি। এর মধ্যে ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে ৯০ জন, পাবনায় ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জনকে ডায়ালাইসিস সেবাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অল্প দিনের মধ্যেই আমার সিলেটসহ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপকভাবে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করবো।
এছাড়া, দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশের কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা নিশ্চিত করতে আরও নার্স নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে।
ইতোমধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আওতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের থেকে এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীকে সরকারি চাকরিতে ন্যূনতম দুই বছর পূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থীর বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হতে হবে।
গত ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত সমন্বয় সেলের পক্ষ থেকে এ সভার আয়োজন করা হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে সভার কার্যবিবরণী (রেকর্ড অব নোটস) পাঠানো হয়। চলতি বছরের ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এদিন অনুষ্ঠিত এক সভায় দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। এর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ঢাকায়। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে এ সেবা এখনো অপ্রতুল।

নথি অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু হওয়ার তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা স্থাপনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এরমধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসনির্ভর হয়ে পড়েন। তবে এ সেবা মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার বহু রোগী চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার।

১২ আগস্টের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আড়াই হাজার নার্সসহ মোট পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে প্রতি ব্যাচে থাকবে ৫০ থেকে ১০০ জন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) এবং ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকের অভাব দূর করতে প্রবেশনারি চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়ন করা হবে। যদি কোনো উপজেলায় উপযুক্ত চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তবে পাশের উপজেলা বা জেলা থেকে চিকিৎসক সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে।

এছাড়া, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক এবং কনসালট্যান্টদের স্বয়ংক্রিয় পদায়ন নিশ্চিত করা; এক মাসের মধ্যে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা এবং মিরপুরে মেডিকেল কলেজের পরিবর্তে একটি ৬০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়।
সূত্র: বাসস