বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। চলতি বছর বিশ্বব্যাপী ১৫ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মশার ঘনত্ব ও ভাইরাসের রূপান্তর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশেও গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ এবং আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ এ বছরের ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’। এছাড়া, স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী অক্টোবরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
গত মে মাসে যত সংক্রমণ ছিল, জুনে তার তিন গুণ সংক্রমণ হয়েছে। আবার জুলাইয়ের সংক্রমণ জুন মাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এ সময় মৃত্যুও বেড়েছে তিন গুণের কাছাকাছি। গত আগস্ট মাসে তার আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি সংক্রমণ হয়েছে, বেড়েছে মৃত্যুও।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু উড়ন্ত মশা নিধন যথেষ্ট নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ বাড়ির ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা সামান্য পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। তাই মশা মারার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি কোথায় পানি জমছে, তা চিহ্নিত করে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ‘সোর্স রিডাকশন’ বা মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতির কাছাকাছি পানি জমে থাকা পাত্রে ডিম পাড়ে। প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, বালতি, ফুলের টব, পানির ড্রাম, ডিশ, পুরোনো টায়ার কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের গর্তে জমে থাকা বৃষ্টির পানিও হতে পারে এডিসের প্রজননস্থল।

বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির উঠান, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের ঝোপঝাড় নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা ও এমন কোনো খোলা পাত্র রাখা যাবে না, যেখানে বৃষ্টির পানি জমতে পারে। বালতি, ড্রাম কিংবা ফুলের টবের নিচে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত ফেলে দিতে হবে। পানির পাত্র সবসময় ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করাও জরুরি।
পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল ও নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে ফেলতে হবে। এসব জিনিস রাখতে হলে এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে তাতে পানি জমতে না পারে।
এডিস মশার প্রজননের জন্য বড় জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না। ফুলের টবের ট্রে, ছাদের কোণা, বাড়ির ড্রেন কিংবা ছোট কোনো পাত্রে জমে থাকা সামান্য পানিতেও এরা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু দৃশ্যমান বড় জলাধার নয়, বাড়ির প্রতিটি ছোট জায়গাও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

দিনের বেলা মশার কামড়ে সতর্ক থাকুন
প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি মশার কামড় এড়ানোও জরুরি। এডিস মশা দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকালের দিকে বেশি সক্রিয় থাকে। এ সময়ে বাইরে বের হলে শরীর যতটা সম্ভব ঢাকা পোশাক পরতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ত্বকে মশা প্রতিরোধক (রিপেলেন্ট) ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘরের দরজা-জানালায় মশানিরোধী নেট ব্যবহার এবং দিনে ঘুমানোর সময় মশারি টাঙানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।