দেশে প্রথমবারের মতো হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগীর কনুইয়ের জয়েন্টসহ সম্পূর্ণ বাহু বা ‘টোটাল হিউমেরাস’ প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে ‘লিম্ব স্যালভেজ’ বা অঙ্গ রক্ষার চিকিৎসা বলা হয়।
ক্যানসারে আক্রান্ত ওই রোগী দেশের বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। তার বাম বাহুর হাড় অপসারণ করে কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আলোক হেলথ কেয়ার অ্যান্ড হসপিটালে টানা চার ঘণ্টা সময় নিয়ে এ অস্ত্রোপচার করা হয়।
অস্ত্রোপচারের প্রায় ছয় ঘণ্টা পর রোগীকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন। অস্ত্রোপচার করা বাম হাতের কবজি ও আঙুলও তিনি নাড়াতে পারছিলেন। চিকিৎসকদের দাবি, রোগী এখন ক্যানসারমুক্ত। তিনি দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) অর্থো-অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সিরাজুস সালেহীনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি দল অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করে। ভাস্কুলার সার্জন ডা. এসএম পারভেজ আহমেদ সোহেল রক্তনালি ও স্নায়ু রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। জটিল এ অস্ত্রোপচার তত্ত্বাবধানে ছিলেন অধ্যাপক ডা. শাহ্ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ।
হাড়ের ক্যানসার এক সময় যেখানে অঙ্গচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি করত, সেখানে দেশেই সম্পূর্ণ বাহুর হাড় প্রতিস্থাপনের এই সাফল্য অঙ্গ রক্ষার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ডা. সালেহীন হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় দক্ষ। তাঁর জানা মতে, বাংলাদেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচার এটাই প্রথম এবং এটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বিদেশে এ ধরনের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের মতো দেশে একটি টোটাল হিউমেরাস বা ফিমার প্রস্থেসিসের দাম প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ লাখ টাকার বেশি। বাংলাদেশে রোগীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে অধ্যাপক সালেহীন সাশ্রয়ী মূল্যে ‘মেড টু অর্ডার’ ইমপ্লান্টের ব্যবস্থা করছেন।
অধ্যাপক সালেহীন বলেন, আগে হাড়ের ক্যানসার মানেই ছিল অঙ্গচ্ছেদ, এখন আমরা প্রস্থেসিস প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগীর অঙ্গ ও ভবিষ্যৎ দুই-ই বাঁচাচ্ছি।

তবে চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের অস্ত্রোপচারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘মার্জিন ফ্রি’ সার্জারি নিশ্চিত করা—অর্থাৎ আক্রান্ত হাড়ের চারপাশে যেন কোনো ক্যানসার কোষ অবশিষ্ট না থাকে। একই সঙ্গে রক্তনালি ও গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু রক্ষা করাও ছিল অত্যন্ত জটিল।
তারা জানান, এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর পেশির কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা স্বাভাবিক জীবনযাপনে বড় বাধা তৈরি করে না। রোগী দৈনন্দিন কাজ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন। ফলে অঙ্গ বাঁচানোর পাশাপাশি স্বাবলম্বী জীবনযাপনের সুযোগও তৈরি হয়।

অধ্যাপক ডা. শাহ্ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ এ চিকিৎসাকে আরও গণমুখী করতে কৃত্রিম হাড়ের ইমপ্লান্টের ওপর কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, হার্টের রিং ও ডায়ালিসিসের সরঞ্জামের ওপর কর ছাড় এবং অসচ্ছল ও দুরারোগ্য রোগীদের সহায়তা তহবিল দ্বিগুণ করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে হাড়ের ক্যানসারের জীবনরক্ষাকারী ইমপ্লান্টের ওপর কর প্রত্যাহার করা হলে দরিদ্র রোগীরা আরও কম খরচে এ চিকিৎসা নিতে পারবেন।

অধ্যাপক সালেহীন ২০১৫–১৬ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের রয়্যাল অর্থোপেডিক হসপিটাল থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। পরে অধ্যাপক ডা. শাহ্ মুহাম্মদ আমান উল্লাহও একই হাসপাতাল থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তাঁদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে অঙ্গ না কেটে হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় একের পর এক মাইলফলক তৈরি হচ্ছে।
এর আগে, ২০১৯ সালে অধ্যাপক সালেহীনের নেতৃত্বে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে ‘টোটাল ফিমার’—সম্পূর্ণ ঊরুর হাড় ও হাঁটুসহ প্রতিস্থাপন করা হয়। এবার সেই ধারাবাহিকতায় সম্পূর্ণ বাহুর হাড় বা টোটাল হিউমেরাস প্রতিস্থাপনের সাফল্য এসেছে।