ব্যস্ততার কারণে অনেকেই ঘুমের সময় কমিয়ে দেন। কেউ মনে করেন, চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমালেই যথেষ্ট, আবার কেউ দিনে কয়েকবার অল্প সময় করে ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়মিত কম ঘুমিয়েও কি শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ রাখা সম্ভব?
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এর উত্তর হলো—না। প্রাপ্তবয়স্কদের সুস্থ থাকতে সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের মান ভালো হলেও নিয়মিতভাবে প্রয়োজনের চেয়ে কম ঘুমানো দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
চার ঘণ্টা ঘুম কি যথেষ্ট?
বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রতি রাতে চার ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট নয়। অল্প সময় ঘুমানোর পর সাময়িকভাবে সতেজ মনে হলেও দীর্ঘদিন এভাবে চললে ঘুমের ঘাটতি জমতে থাকে। দীর্ঘদিন সাত ঘণ্টার কম ঘুমের সঙ্গে বিষণ্ণতা, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে ১০ হাজারের বেশি মানুষের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত চার ঘণ্টা ঘুমানোর প্রভাব মস্তিষ্কের বয়স প্রায় আট বছর বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনীয়।
কম ঘুমিয়েও ভালো থাকেন কেউ কেউ
কম ঘুমের ক্ষেত্রে একটি বিরল ব্যতিক্রম রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এডিআরবি১ জিনের একটি বিরল মিউটেশনের সন্ধান পেয়েছেন, যার কারণে কিছু মানুষ ৬ দশমিক ৫ ঘণ্টার কম ঘুমিয়েও বিশ্রামপ্রাপ্ত অনুভব করতে পারেন এবং আপাতদৃষ্টিতে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা যায় না। তবে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিরল। তাই সাধারণ মানুষের জন্য কম ঘুমকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
দিনে কয়েকবার ঘুমালে কি ঘাটতি পূরণ হবে
একটানা রাতের ঘুমের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টায় কয়েকবার ঘুমানোর পদ্ধতিকে বলা হয় পলিফেজিক স্লিপ। এর একটি পরিচিত ধরন ‘উবারম্যান’ স্লিপ শিডিউল। এতে দিনে ছয়বার ২০ মিনিট করে ঘুমানোর কথা বলা হয় অর্থাৎ মোট ঘুম মাত্র দুই ঘণ্টা।
এই পদ্ধতির সমর্থকেরা মনে করেন, এতে কম সময় ঘুমিয়েও পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এর পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং গবেষণায় পলিফেজিক ঘুমের সঙ্গে ঘুমের ঘাটতির মতো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৯০ মিনিটের চক্রের হিসাব কি কাজে আসে?
ঘুমের একটি চক্র সাধারণত ৯০ মিনিটের বলে প্রচলিত ধারণা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ৭০ থেকে ১২০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। একজন মানুষ সাধারণত রাতে চার থেকে ছয়টি ঘুমের চক্রের মধ্য দিয়ে যান। ঘুমের শুরুতে গভীর ঘুম বা এন৩ পর্যায় বেশি থাকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরইএম ঘুমের সময় বাড়ে।
আরইএম পর্যায়ে মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও স্মৃতি সংরক্ষণের মতো কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমালে শরীর কিছুটা শারীরিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেলেও মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম নাও পেতে পারে।
কম ঘুমেও সতেজ লাগে কেন?
কখনো কম ঘুমানোর পরও সকালে বেশ সতেজ মনে হতে পারে। এর একটি কারণ হতে পারে স্লিপ ইনারটিয়া। ঘুম থেকে ওঠার পর সাময়িক ঝিমঝিম বা ঘুমঘোর। ঘুমের হালকা পর্যায়ে জেগে উঠলে এই অনুভূতি কম হতে পারে। তখন মনে হয়, কম ঘুমিয়েও বেশ ভালো আছি। কিন্তু এটি পর্যাপ্ত ঘুমের প্রমাণ নয়। দিনের পরবর্তী সময়ে ঘুমের ঘাটতির প্রভাব দেখা দিতে পারে।
ঘুম কম হলে কী করবেন
কাজের চাপ বা অন্য কোনো কারণে কয়েক দিন কম ঘুমাতে হলে ঘুমের মান ভালো করার কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে। ঘুমানোর আগে অন্তত এক ঘণ্টা স্ক্রিন এড়িয়ে চলা, শোবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা, বিছানায় মোবাইলসহ অন্যান্য বিভ্রান্তির উৎস না রাখা, ক্যাফেইন কম খাওয়া, হালকা শরীরচর্চা করা, পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া, ঘুমের আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, রাতে অতিরিক্ত তরল পান না করা, প্রয়োজনে দিনে প্রায় ২০ মিনিটের ছোট ন্যাপ নেওয়া, দিনের আলোতে কিছু সময় কাটানো। এসব অভ্যাস ঘুমের প্রয়োজনীয় সময়ের বিকল্প নয়।
সুতরাং ঘুমের মান ভালো হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি ঘুমের সময়ের বিকল্প হতে পারে না। চার ঘণ্টা বা তারও কম ঘুমিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার কোনো প্রমাণিত কৌশল নেই। বরং পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।
সূত্র: হেলথলাইন