আবহাওয়া একটু বদলালেই কি আপনার শিশুও অসুস্থ হয়ে পড়ে? এর পেছনে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া দায়ী নয়। শিশুদের কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, বন্ধ ঘরে বেশি সময় কাটানো এবং ভাইরাসের সংক্রমণও এর বড় কারণ। আবার সবসময় এসব উপসর্গ সংক্রমণের কারণে হয় না কখনো এটি হতে পারে মৌসুমি অ্যালার্জিও। ঋতু পরিবর্তনের সময় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওঠানামা শিশুদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আবহাওয়া পরিবর্তন নিজে থেকে কোনো ভাইরাস তৈরি করে না। শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় তারা সংক্রমণের প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল। হিন্দুস্তান টাইমসে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অঙ্কুর চাওলা জানিয়েছেন, তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন নাক ও গলার স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
আবহাওয়া বদলালে শিশুরা কেন বেশি অসুস্থ হয়
নাক ও গলার ভেতরে থাকা মিউকাস এবং ক্ষুদ্র চুলের মতো গঠন সিলিয়া শ্বাসের সঙ্গে ঢুকে পড়া জীবাণু ও ক্ষতিকর কণাকে আটকে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন, শুষ্ক বা ঠান্ডা বাতাস এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার

কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটানোর সুযোগ পেতে পারে। এর সঙ্গে শিশুদের তুলনামূলক অপরিণত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও যুক্ত হয়। ফলে বড়দের তুলনায় তারা সহজেই সর্দি-কাশি বা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে।
ঘরে থাকলেও কি শিশু অসুস্থ হয়
শিশুকে অসুস্থতা থেকে বাঁচাতে অনেক বাবা-মা আবহাওয়া খারাপ হলে জানালা-দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরেই রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত সময় বন্ধ ঘরে থাকাও কখনো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। স্কুল, ডে-কেয়ার বা বাড়িতে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় কাছাকাছি থাকলে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়ে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) এবং সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রের ক্ষুদ্র কণা ও হাতের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। তাই শুধু শিশুকে ঘরে রাখাই যথেষ্ট নয়। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এটা সংক্রমণ নাকি মৌসুমি অ্যালার্জি?
তবে চিকিৎসক জানিয়েছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুর কাশি, হাঁচি বা নাক বন্ধ হলেই সেটিকে সংক্রমণ বলা যায় না। পরাগরেণু, ধুলাবালি বা বাতাসের আর্দ্রতার পরিবর্তনের কারণেও এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা নাকের অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, বারবার হাঁচি, নাক বন্ধ থাকা, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং স্বচ্ছ সর্দি—এসব

অ্যালার্জির সাধারণ লক্ষণ। অন্যদিকে, জ্বর এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকলে তা সংক্রমণের সম্ভাবনাকেই বেশি নির্দেশ করে।
শিশুকে সুস্থ রাখতে বাবা-মায়ের করণীয়
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুর দৈনন্দিন রুটিন ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং বয়স অনুযায়ী শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা শিশুর সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি
*নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করান।
*ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
*অসুস্থ ব্যক্তির খুব কাছাকাছি শিশুকে না রাখাই ভালো।
*শিশুকে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার দিন।
*শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকাগুলো সময়মতো দিন।
*ঘুমের সময়সূচি নিয়মিত রাখুন।
যেসব লক্ষণ থেকলেই বিপদ: সাধারণ সর্দি-কাশি বেশিরভাগ সময় গুরুতর নয়। তবে কিছু লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। এই

৬টি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে শিশুকে নিতে হবে। এগুলো হলো:
*শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
*বারবার বা দীর্ঘসময় বমি হওয়া
* পানিশূন্যতার লক্ষণ
*ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়া
*অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত ক্লান্তি
*ভালো হওয়ার পর আবার উপসর্গ বেড়ে যাওয়া
ঋতু পরিবর্তন হলেই শিশুকে সবসময় অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে এমন নয়। আবহাওয়া সরাসরি সংক্রমণ ঘটায় না বরং এই সময়ে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, শ্বাসতন্ত্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সংক্রমণের পরিবেশের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিশুকে ঘরে বন্দি করে রাখার বদলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, পানি পান, ঘরে ভালো বায়ু চলাচল এবং সময়মতো টিকা নিশ্চিত করুন। আর শিশুর স্বাভাবিক সর্দি-কাশি যদি খুব বেড়ে যায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।