শুধু কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করলেই হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় না। কারণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়। রক্তে চর্বি ও শর্করার মাত্রা, শরীরে প্রদাহ কিংবা হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ—এসব বিষয়ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেতে চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের রক্তপরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। তবে সবার জন্য সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আগের অসুস্থতা ও সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করেই কোন পরীক্ষা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা উচিত।
১. অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি
অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি বা অ্যাপোবি পরীক্ষা রক্তে থাকা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বহনকারী কণিকার সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এসব কণিকা ধমনির দেয়ালে চর্বি জমার সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণ এলডিএল কোলেস্টেরলের পাশাপাশি অ্যাপোবি পরীক্ষা করলে কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে বাড়তি তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

২. লাইপোপ্রোটিন-এ
হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে বংশগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। লাইপোপ্রোটিন-এ বা এলপি(এ) পরীক্ষা সেই ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। শরীরে এর মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পরিবারের কারও অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক এই পরীক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।
৩. এইচএস-সিআরপি
এইচএস-সিআরপি বা হাই-সেনসিটিভিটি সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন পরীক্ষা শরীরে প্রদাহের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু এই পরীক্ষার ফল দিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। অন্যান্য স্বাস্থ্যতথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফলাফল মূল্যায়ন করতে হয়।
৪. ফাস্টিং ইনসুলিন
খালি পেটে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। বিপাকীয় স্বাস্থ্যের মূল্যায়নে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই পরীক্ষা সহায়ক হতে পারে। তবে সবার জন্য এটি নিয়মিত পরীক্ষা নয়।

৫. হিমোগ্লোবিন এ১সি
হিমোগ্লোবিন এ১সি বা এইচবিএ১সি পরীক্ষার মাধ্যমে গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ওমেগা-৩ ইনডেক্স
লোহিত রক্তকণিকায় থাকা ইপিএ ও ডিএইচএ নামের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে ওমেগা-৩ ইনডেক্স। শরীরে দীর্ঘমেয়াদে ওমেগা-৩-এর অবস্থার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই পরীক্ষার মাধ্যমে। তবে এটি সবার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মিত হৃদ্রোগের পরীক্ষা নয়।
৭. ট্রাইগ্লিসারাইড ও এইচডিএল অনুপাত
রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে এই অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের একটি সূচক হতে পারে। তবে শুধু এই অনুপাতের ওপর ভিত্তি করে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা ঠিক নয়। অন্যান্য কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রার সঙ্গেও বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।
৮. ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে ভিটামিন ডি কম থাকলেই হৃদ্রোগ হবে—এমনটা বলা যায় না। একইভাবে শুধু ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেই হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমন নিশ্চিত প্রমাণও নেই। মাত্রা কম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

৯. এনটি-প্রোবিএনপি
হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে কিনা, তা বোঝার ক্ষেত্রে এনটি-প্রোবিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিশেষ করে হার্ট ফেইলিউরের মতো পরিস্থিতি মূল্যায়নে চিকিৎসকেরা এটি ব্যবহার করেন। হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি হলে উপসর্গের পাশাপাশি এই পরীক্ষার ফলও চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু একটি বা কয়েকটি রক্তপরীক্ষার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ওজন, ধূমপানের অভ্যাস, পারিবারিক ইতিহাস ও জীবনযাপন—সবকিছু বিবেচনা করেই সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষাগুলো করানোই সবচেয়ে ভালো।