ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় ভারী ধাতু ও মলবাহিত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। এসব পণ্যে সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদসহ ১৪ ধরনের ভারী ধাতু শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ই. কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ ও অঙ্গহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত আগস্টে ‘ডুয়াল বারডেন অব কেমিক্যাল অ্যান্ড মাইক্রোবায়াল হ্যাজার্ডস ইন ডেইরি প্রডাক্টস ফ্রম ঢাকা, বাংলাদেশ: আ কমপ্রিহেনসিভ ফুড সেফটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্রস মার্কেট সিস্টেম’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অংশ নেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন খামার, বাজার ও বিক্রয়কেন্দ্র থেকে মোট ৮৪টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছিল ৫০টি কাঁচা দুধ, ১২টি ফুটানো দুধ, ১০টি পনির, পাঁচটি বাণিজ্যিক দই, ১০টি রাস্তার মাঠা, পাঁচটি মিষ্টি বা টক দই এবং ঘি ও মাখনের পাঁচটি নমুনা। দুধ সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে দূষণের চিত্র বুঝতে নিবন্ধিত ও অনানুষ্ঠানিক—দুই ধরনের বাজার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে শনাক্ত ১৪ ধরনের ভারী ধাতুর মধ্যে সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা বিভিন্ন পণ্যে নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে সব ধরনের পরীক্ষিত পণ্যে। সবচেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে পনিরে—প্রতি লিটারে ০.৭৮৪ মিলিগ্রাম। গবেষণায় উল্লেখিত নিরাপদ সীমা ০.০২ মিলিগ্রাম হিসাবে এ মাত্রা প্রায় ৩৯ গুণ বেশি।
পনিরে আর্সেনিকের পরিমাণও উদ্বেগজনক। গবেষণায় এর মাত্রা প্রতি লিটারে প্রায় ৬২.৮৬ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নিরাপদ সীমা ০.০৫ মিলিগ্রাম। এ ছাড়া পনির, কাপ দই ও বীজ দইয়ে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি পাওয়া গেছে। কাঁচা ও ফুটানো দুধ কিংবা মাঠায় পারদ পাওয়া না গেলেও পনির ও ঘিতে এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কাঁচা দুধ থেকে পনির পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যে নিকেলের মাত্রাও অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। তবে তামা ও জিংকের মাত্রা মোটামুটি নিরাপদ সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের (সিএআরএস) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষক দলের সদস্য ড. আসমা রহমান বলেন, গবাদিপশুর খাদ্য, ঘাস জন্মানোর মাটি কিংবা পানির মাধ্যমে দুধে ভারী ধাতু প্রবেশ করতে পারে। তবে দূষণের সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুধে এসব ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় তা দিয়ে তৈরি অন্যান্য পণ্যেও দূষণের ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ই. কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক দলের সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, খামার থেকেই দুধ দূষিত হতে পারে। তাঁর দাবি, সাভার থেকে ঢাকায় দুধ আনার সময় কোথাও কোথাও বুড়িগঙ্গার পানিও মেশানো হয়। দূষিত কাঁচা দুধ দিয়ে তৈরি পণ্যেও জীবাণু থাকতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেন, ই. কোলাইয়ের কারণে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ হতে পারে। দুধ ভালোভাবে ফুটালে এসব ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়। তবে ফুটিয়ে নিলেও ভারী ধাতুর ঝুঁকি দূর হয় না। দীর্ঘদিন এসব ধাতু শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশুখাদ্য, পানি, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।