জটিল রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নির্ভুলতার পরিচয় দিয়েছে মাইক্রোসফটের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ব্যবস্থা। মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুস্তাফা সুলেইমান এমনটাই দাবি করেছেন।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, জটিল রোগের অনুকরণমূলক পরিস্থিতিতে এআই ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক রোগ শনাক্ত করেছে। বিপরীতে, চিকিৎসকদের সাফল্যের হার ছিল ৩৬ শতাংশ। তবে বাস্তব হাসপাতালে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা এখনো যাচাই করা হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। একই দিন প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গবেষণায় মাইক্রোসফটের তৈরি এমএআই-ডিএক্সও (MAI-DxO) নামের এআই ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা করতে সক্ষম আরও উন্নত এআই তৈরি করা, যাকে তারা ‘মেডিকেল সুপারইন্টেলিজেন্স’ বা চিকিৎসাক্ষেত্রে অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা হিসেবে অভিহিত করছে।

গবেষকেরা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত ৩০০টির বেশি জটিল ও বিরল রোগের ঘটনা ব্যবহার করে এআই এর সক্ষমতা পরীক্ষা করেন। এতে রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস ও পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করার দক্ষতা যাচাই করা হয়।
পরীক্ষায় এআই এর সাফল্যের হার ছিল ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে, চিকিৎসাবিষয়ক তথ্যসূত্র ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া সাধারণ চিকিৎসকদের সঠিক রোগ নির্ণয়ের হার ছিল ৩৬ শতাংশ।
ধাপে ধাপে রোগ নির্ণয়
এআই এর কাজের পদ্ধতি প্রচলিত অনেক এআই ব্যবস্থার চেয়ে আলাদা। এটি একাধিক ভার্চ্যুয়াল চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে কাজ করে। প্রথমে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রশ্ন তৈরি করে।
এরপর সম্ভাব্য রোগ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচন করে এবং পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে। নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা ও পরবর্তী পদক্ষেপও হালনাগাদ করে।

এ প্রক্রিয়ায় ‘অর্কেস্ট্রেটর’ নামের একটি সমন্বয়কারী ব্যবস্থা বিভিন্ন এআই এজেন্টের কাজ পরিচালনা করে। ফলে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে যুক্তি বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাছাই করা সম্ভব হয়।
গবেষণায় রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও বিবেচনা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এআই ব্যবস্থা কম খরচে রোগ শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সব ধরনের এআই মডেল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পরিস্থিতিতে একই ধরনের উন্নতি দেখা যায়নি। গবেষণায় অন্য প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই মডেলও পরীক্ষা করা হয়।
বাস্তব প্রয়োগে এখনো পরীক্ষা বাকি
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এআই চিকিৎসকদের পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ, গবেষণায় মূলত পূর্বপ্রকাশিত জটিল রোগের ঘটনা ও অনুকরণমূলক পরিস্থিতি ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে রোগীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ, শারীরিক পরীক্ষা, জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চিকিৎসার ফলাফল মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো অনেক বেশি জটিল।
এছাড়া গবেষণায় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল। অথচ বাস্তবে জটিল রোগ নির্ণয়ে একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত মতামত নেওয়া হতে পারে। তাই এআই এর ফলাফলকে সব ধরনের চিকিৎসকের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা।

প্রযুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে মাইক্রোসফট। সেখানে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের প্রাথমিক মূল্যায়নে এআই এর সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে। চিকিৎসকদের মূল্যায়নের সঙ্গে এআইয়ের সুপারিশ তুলনা করে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা হবে।
মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুস্তাফা সুলেইমানের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে এআইকে রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও কার্যকর করে তোলা। তবে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভুল রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকি কমানো এবং বাস্তব চিকিৎসায় ইতিবাচক ফল অর্জনের প্রমাণ পাওয়া না পর্যন্ত এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।