ডেঙ্গু মোকাবেলায় বছরজুড়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দেশব্যাপী নজরদারি, গবেষণা এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু মশা নিধন বা হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রমাণভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যায়ে রোগী শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, গবেষক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্প্রতি দৈনিক বণিক বার্তার কার্যালয়ে ‘ডেঙ্গু মোকাবেলা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। বণিক বার্তা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) যৌথভাবে এ আয়োজন করে। বৈঠকে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ বিশেষ সংবাদদাতা মো. বদরুল আলম।

অনু্ষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে রোগ প্রতিরোধের কার্যক্রমেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সিপিডির ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত দুই দশকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বেড়েছে। ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় এবং কখন চিকিৎসা নিতে হবে—এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জমে থাকা পানি ও জলাবদ্ধতা মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি রোগ শনাক্তে দেরি হওয়াও উদ্বেগের বিষয়।

বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, ডেঙ্গু শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, এটি অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তথ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ডেঙ্গুবিষয়ক পরামর্শক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মশা জরিপ ও গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি পূর্বাভাস মডেল ডেঙ্গু বাড়ার আশঙ্কা প্রায় পাঁচ মাস আগেই জানিয়েছিল। তাঁর আশঙ্কা, নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কম নাও হতে পারে।
তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু অভিযান চালালেই হবে না, বাড়ি, আঙিনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. মো. শফিউল আলম বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার মূলত কমিউনিটিতে ঘটে। অথচ দেশে এখনো সমন্বিত জাতীয় ভেক্টর নজরদারি ব্যবস্থা নেই। নির্দিষ্ট সময় ও এলাকায় সীমিত জরিপ দিয়ে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। রোগ নজরদারি, মশা নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও টিকাদান কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জি এম সাইফুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ ও এপিডেমিওলজিস্টদের নিয়ে একটি জাতীয় বিশেষজ্ঞ ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এলাকায় কীটনাশক প্রয়োগ এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কোথায় রোগী বাড়ছে, সংক্রমণের উৎস কোথায়—তা চিহ্নিত করতে নিয়মিত জরিপ ও সেরোসার্ভেইল্যান্স চালানো দরকার।
চিকিৎসার পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মুস্তাক হোসেন বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে রোগী শনাক্ত করলেই হবে না, সেখানে চিকিৎসার সক্ষমতাও থাকতে হবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গুরুতর রোগীর চিকিৎসায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও প্লেটলেট পৃথক করার যন্ত্রের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সময়মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাজহারুল ইসলাম সোহেল বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মশা নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকার কারণে রোগীর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ডেঙ্গুর লক্ষণ, বিপৎসংকেত, পরীক্ষা এবং কখন চিকিৎসা নিতে হবে—এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড কমিউনিটি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতীকুল ইসলাম বলেন, রোগীর মৃত্যু হলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা থাকে। এতে বিশেষ করে নবীন চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রতিটি মৃত্যুকে চিকিৎসায় অবহেলা হিসেবে উপস্থাপন না করে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।