চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুলে গিয়ে বমি, পেটব্যথাসহ নানা উপসর্গ নিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা। অভিভাবকরা জানান, স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খাওয়ার পরই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে আগের দিনের বেঁচে যাওয়া খাবার পরদিনও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এছাড়া, স্কুলের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
গত ৬ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নয়াগোলা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১১ শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে বমি ও পেটব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুব হাসান বলেন, খাবার ছাড়াও পরিবেশনের পদ্ধতি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা অন্য কোনো সংক্রমণ থেকেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনকি স্কুলে খোলা খাবার খেলেও এমন হতে পারে।
মুসলেমা বেগম নামের এক অভিভাবক বলেন, স্কুল ফিডিংয়ের খাবার বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে। প্রতিদিন বেঁচে যাওয়া অতিরিক্ত খাবার শিক্ষকরা রেখে দেন। শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি থাকায় এসব খাবার নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যেই বিরোধ তৈরি হয়।
রুমালি বেগম নামের আরেক অভিভাবক বলেন, একটি শ্রেণিতে ৮০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও প্রতিদিন সবাই উপস্থিত থাকে না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই অতিরিক্ত খাবার নিয়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে এবং তারা মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।

এছাড়া, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনাও রয়েছে প্রশ্নের মুখে। বিদ্যালয়ে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় শ্রেণিকক্ষ, বারান্দা ও টয়লেট পরিষ্কারের দায়িত্ব অনেক সময় শিক্ষার্থীদেরই নিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও তাদের করতে হয়। শ্রেণিকক্ষ, বারান্দা ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পাশাপাশি অনেক সময় তাদের দিয়ে টয়লেটও পরিষ্কার করানো হয়। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন টয়লেট পরিষ্কার করতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়তে হচ্ছে তাদের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪১ হাজার শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ফলে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, পরিবহন থেকে পরিবেশন প্রতিটি ধাপেই কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
স্কুলের এমন অব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি নয়াগোলা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম।
তবে খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিশান ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার মো. নুরুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের নজরদারির মধ্যেই নিয়ম মেনে পাউরুটি উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদনের সময় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় খাবারের মান পরীক্ষা করা হয়।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিন এসব পণ্য উৎপাদন করি। কিন্তু যে স্কুলে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়েছে। সেই স্কুলে পাওয়া গেছে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য। এসব কোথা থেকে আসছে আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের কোনো ত্রুটি নেই।
খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাম উন্নয়ন কর্মের (গাক) সহকারী পরিচালক মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ে খাবার সরবরাহের আগেও তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। খাবার বুঝে নেওয়ার সময় মান যাচাই করে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষর করে। তাহলে কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার স্কুলে পাওয়া যায়। অবশ্যই স্কুল শিক্ষকদের গাফিলতি রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এর আগেও শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আগের ঘটনায় খাবার পরীক্ষা করে ফুড পয়জনিংয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনেক সময় খোলা খাবার খেয়েও শিশুরা অসুস্থ হয়। আর ওই স্কুলটির শিক্ষকদের মধ্যে একটি ঝামেলা রয়েছে। সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করা হবে।