রক্তের সাধারণ পরীক্ষা করাতে গেলে অনেকেই সিবিসি (CBC বা Complete Blood Count) করান। এই পরীক্ষায় রক্তের লোহিত কণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা, প্লেটলেট এবং হিমোগ্লোবিনসহ রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই রক্তের রিপোর্টে কোনো মান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম দেখলে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, এর সঙ্গে কি ব্লাড ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে?
কিছু ক্ষেত্রে সিবিসি রিপোর্টে এমন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যা চিকিৎসককে রক্তের কোনো গুরুতর সমস্যা নিয়ে আরও পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক মাত্রা, হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া বা প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো বিষয় চিকিৎসকের নজরে আসতে পারে। কিন্তু শুধু একটি সিবিসি রিপোর্ট দেখে ব্লাড ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না।সিবিসি পরীক্ষায় কী দেখা হয়?
সিবিসি মূলত রক্তের প্রধান কয়েকটি উপাদান সম্পর্কে তথ্য দেয়। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত রক্তকণিকা বা RBC, শ্বেত রক্তকণিকা বা WBC এবং প্লেটলেট। একই সঙ্গে হিমোগ্লোবিন, হেমাটোক্রিট এবং লোহিত রক্তকণিকার আকার সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়।
শরীরে রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ বা রক্তের বিভিন্ন সমস্যার প্রাথমিক ধারণা পেতে এই পরীক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে লিউকেমিয়ার মতো ব্লাড ক্যানসারের সন্দেহ তৈরিতেও সিবিসি সহায়তা করতে পারে।
কোন পরিবর্তন দেখে চিকিৎসকের সন্দেহ হতে পারে?
সিবিসি রিপোর্টে কিছু অস্বাভাবিকতা থাকলে চিকিৎসক বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখতে পারেন। যেমন, শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া কিংবা প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়া।
কিছু ধরনের লিউকেমিয়ায় রক্তে অপরিণত শ্বেত রক্তকণিকা বা ব্লাস্ট দেখা যেতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তের বিভিন্ন কোষের সংখ্যা ও গঠনে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এসব পরিবর্তন চিকিৎসককে আরও পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব পরিবর্তনের সবগুলোর অর্থ ক্যানসার নয়। সংক্রমণ, পুষ্টির ঘাটতি, কিছু ওষুধ, দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ বিভিন্ন কারণেও সিবিসি’র ফল স্বাভাবিক সীমার বাইরে যেতে পারে।
সিবিসি রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেও কি ব্লাড ক্যানসার থাকতে পারে?
শুধু সিবিসি স্বাভাবিক এসেছে বলে সব ধরনের ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় না। কোন ধরনের ক্যানসার সন্দেহ করা হচ্ছে, রোগের পর্যায় এবং ব্যক্তির অন্যান্য উপসর্গের ওপর পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের (NCI) তথ্য অনুযায়ী, কোনো একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে সাধারণভাবে ক্যানসার নিশ্চিত বা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। চিকিৎসককে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
তাহলে ব্লাড ক্যানসার নিশ্চিত করতে কী পরীক্ষা লাগে?
সিবিসি অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও পরীক্ষা দিতে পারেন। এর মধ্যে থাকতে পারে Peripheral Blood Smear, যেখানে রক্তের কোষগুলো মাইক্রোস্কোপে দেখে তাদের আকার ও গঠন পরীক্ষা করা হয়। লিউকেমিয়ার সন্দেহ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে Bone Marrow Aspiration বা Bone Marrow Biopsy করা হয়। কারণ রক্তের কোষ তৈরি হয় অস্থিমজ্জায় এবং সেখানে অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি শনাক্ত করা রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ছাড়া রোগের ধরন অনুযায়ী Immunophenotyping, Cytogenetic Analysis বা অন্যান্য বিশেষ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এসব পরীক্ষা ক্যানসারের ধরন নির্ধারণ এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরিতেও সাহায্য করে।
লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে CBC কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
লিউকেমিয়া হলো রক্ত ও অস্থিমজ্জার ক্যানসারের একটি গ্রুপ। এই রোগের সন্দেহ হলে সিবিসি সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোর একটি। উদাহরণ হিসেবে, Acute Myeloid Leukemia বা AML-এর ক্ষেত্রে অনেক রোগীর রক্তে অপরিণত শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যেতে পারে এবং লোহিত রক্তকণিকা ও প্লেটলেট কমে যেতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন দেখেই চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় করা হয় না। অস্থিমজ্জার কোষ পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষাও লাগতে পারে। আবার Chronic Lymphocytic Leukemia বা CLL-এর ক্ষেত্রে রক্তে লিম্ফোসাইটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্লু হতে পারে। কিন্তু সেখানেও নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয়ের জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
সিবিসি রিপোর্টে অস্বাভাবিকতা দেখলে কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?
অস্বাভাবিক সিবিসি রিপোর্ট অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়। তবে রিপোর্টে একটি সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম দেখালেই ব্লাড ক্যানসার হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রক্তের পরীক্ষার ফল বয়স, শারীরিক অবস্থা, সাম্প্রতিক সংক্রমণ, ওষুধ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণেও পরিবর্তিত হতে পারে। এমনকি একই ব্যক্তির পরীক্ষার ফলও বিভিন্ন সময়ে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নিজে নিজে ক্যানসারের সিদ্ধান্তে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সিবিসিতে বারবার অস্বাভাবিক ফল আসলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো উচিত। বিশেষ করে অকারণে দীর্ঘদিন দুর্বল লাগা, বারবার সংক্রমণ হওয়া, সহজে শরীরে কালশিটে পড়া বা রক্তপাত, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অনেক সাধারণ কারণও রয়েছে। তাই কোনো একটি লক্ষণকে ব্লাড ক্যানসারের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। সিবিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা। এর মাধ্যমে রক্তের বিভিন্ন কোষের সংখ্যা ও কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লাড ক্যানসারের সন্দেহ তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সিবিসি একা ব্লাড ক্যানসারের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। রক্তের রিপোর্টে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে তার ওপর। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক আরও নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা, অস্থিমজ্জা পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া