সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হেনস্তা, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মাসের পর মাস টাকা ছাড়া মিল গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের প্রফে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নীরবকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।

নীরবকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রিক্তিক হাসান বলেন, এটা সেন্ট্রাল থেকেই করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের অনেকেই অনেক অভিযোগ করছিল। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে একাডেমিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেন্ট্রাল থেকেও সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, নীরবের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ এসেছে। যেমন- শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, ভয় দেখানো। একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আমরা আর বেশি কিছু বলবো না। বিষয়টি এভয়েড করতে চাচ্ছি।
একাডেমিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, একাডেমিক কাউন্সিল তিন কার্যদিবসের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত জানাবে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বড় ধরনে শাস্তি আসতে পারে।
এদিকে, নীরবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিচার চেয়ে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে লিখিতভাবে একাধিক আবেদন করেছেন বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এর আগে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর কলেজের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নীরবের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ একাডেমিক ব্যবস্থা গ্রহণের (স্থায়ীভাবে বহিষ্কার) জোর দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের আবেদনে বলা হয়, কলেজের ১০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নীরব, রোল: ৩০ শিক্ষাবর্ষ: ২৩-২৪. এই মেডিকেলের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীর সাথে যৌন হেনস্থা, জোরপূর্বক ধর্ষণ প্রচেষ্টা এবং এর প্রতিবাদ করলে তাকে নানা প্রকার হুমকির সম্মুখীন করার মতো জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ১২তম ব্যাচের অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীদের অনুরূপ অবস্থা ও প্রস্তাবের সম্মুখীন করছে। ১০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথেও অনুরূপ কার্যকলাপে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এছাড়া, অনেক আভযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

টাকা ছাড়াই মাসের পর মাস মিল গ্রহণ
নীরবের বিরুদ্ধে মাসের পর মাস টাকা না দিয়ে মিল গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলায় এক শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবে এবং অনলাইনে হুমকি দেন নীরব।
এ বিষয়ে গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কলেজের ৩য় বর্ষের এক শিক্ষার্থী অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে তিনি বলেন, আমি ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নীরবের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তুলে ধরছি। আমি এই মাসের মিল ম্যানেজার। মাসের শুরুতে আমাদের হোস্টেলে মিল কমিটির মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে কথা উঠছে যে, সানবিম হক নীরব গত কয়েক মাস থেকে মিল চালায় কিন্তু মিলে কোনো ধরনের টাকা দেয় না।

প্রফে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি
৩য় বর্ষের ওই শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন, ব্যাচমেট হিসেবে আমাকে বলার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি নীরবকে এ বিষয়ে বললে সে আমাকে বলে, ‘মিলের টাকার কথা তোকে কে বলছে? তার নাম বল, তাকে আমি দেখে নিবো। তোদের মিল কমিটি আর রাখবো না, আমি কোনো টাকা দিতে পারবো না, তোরা যা করার করিস।’ শেষে আমাকে বলেছে, ‘তুই বেশি বাড়াবাড়ি করতেছিস; তোকে প্রফে ফেল করায় দিবো।’
‘প্রফ, পিন্সিপাল- সব তার হাতে’
এর আগে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ১২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী কলেজ অধ্যক্ষের কাছে লিখিত আবেদন দেন। এতে তিনি নীরবের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ করে বিচার চান।
আবেদনে তিনি লেখেন, ২৩ জুলাই বলেছিল আজ যেন তোর ব্যাচের সব মাঠে আসে। না হলে কিন্তু অবস্থা খারাপ হবে। ৫টার মধ্যে যেন সবাই যায়। নিজের অনেক লোকজন আছে দেখাতে ক্যাম্পাসে জোরপূর্বক আমাদের ৫-৭ জনকে সাথে নিয়ে ঘুরতো। মাঝে মধ্যে বলতো প্রফ, পিন্সিপাল স্যার, সব তার হাতে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর নীরবের শাস্তি চেয়ে অধ্যক্ষে কাছে লেখা আবেদনে ১২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নীরব নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে বিভিন্ন হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গালিগালাজ করত। যেকোনো সময় হল থেকে বাইরে ডেকে নিয়ে যেত। ফলে পড়াশোনায় সমস্যা হতো।
এছাড়া, নীরবের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, কলেজ অধ্যক্ষের আনুকূল্যে অনেক শিক্ষার্থীকে প্রফ পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন নীরব। বিভিন্ন অন্তরঙ্গ ছবির মাধ্যমে অধ্যক্ষের সঙ্গে তার সখ্যতার বিষয়টি অভিযোগ তুলেন শিক্ষার্থীরা।

নীরবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার আলী বলেন, সাবিম হক নীরবের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ দিয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দেবে। এর ভিত্তিতে একাডেমিক কাউন্সিল ব্যবস্থা নেবে। এখানে আমার একক কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
নীরবের বিরুদ্ধে কলেজ অধ্যক্ষের আনুকূল্যে শিক্ষার্থীদের প্রফ পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি অন্য দিকে নেওয়ার সুযোগ নেই। কাউকে বাড়তি আনুকূল্য দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। নীরবের বিরুদ্ধে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল যে সিদ্ধান্ত দেবেই তাই বাস্তবায়ন হবে।