কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাব তৈরির পাশাপাশি শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজেও কিডনি ভূমিকা রাখে। কিন্তু কিডনিতে ক্যানসার তৈরি হলেও শুরুর দিকে অনেকের তেমন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগটি অনেক সময় অন্য কোনো পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে। কিডনি ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরনগুলোর একটি হলো রেনাল সেল ক্যানসার। কিডনির কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে টিউমার তৈরি হলে এই ক্যানসার হতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যার কয়েকটি খুব সহজেই অন্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা সম্ভব।
প্রস্রাবে রক্ত দেখা

কিডনি ক্যানসারের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো প্রস্রাবে রক্ত আসা। কখনো রক্ত খালি চোখে দেখা যেতে পারে, আবার কখনো প্রস্রাব পরীক্ষার সময় এটি ধরা পড়ে। তবে প্রস্রাবে রক্ত মানেই ক্যানসার নয়। কিডনিতে পাথর, মূত্রনালির সংক্রমণসহ আরও অনেক কারণেও এমন হতে পারে। তারপরও প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কোমর বা পাশের ব্যথা দীর্ঘদিন থাকা
কিডনির অবস্থানের কারণে কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যায় পিঠের নিচের অংশ বা শরীরের এক পাশের দিকে ব্যথা হতে পারে। কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রে এমন ব্যথা দীর্ঘদিন থাকতে পারে এবং সাধারণ বিশ্রামেও পুরোপুরি না কমতে পারে। অবশ্য কোমর বা পাশের ব্যথার আরও অনেক কারণ রয়েছে। পেশিতে টান, মেরুদণ্ডের সমস্যা বা কিডনিতে পাথরও এর কারণ হতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের বা বারবার ফিরে আসা ব্যথার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
খাবার বা শরীরচর্চায় কোনো পরিবর্তন না এনেও যদি দ্রুত ওজন কমতে থাকে, সেটি খেয়াল করার মতো বিষয়। কিডনি ক্যানসারের ক্ষেত্রে অকারণে ওজন কমে যাওয়া এবং ক্ষুধা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে অনিচ্ছাকৃত ওজন কমার পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, হজমের সমস্যা কিংবা অন্য বিভিন্ন রোগও থাকতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন পরিবর্তন চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ক্ষুধা কমে যাওয়া
আগের তুলনায় খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন ক্ষুধা না লাগাও কিডনি ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে এর সঙ্গে ওজন কমা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পেটের ভেতর চাকা বা গাঁট
কিছু ক্ষেত্রে কিডনিতে টিউমার বড় হলে পেটের ভেতরে গাঁট বা চাকা অনুভূত হতে পারে। তবে এটি সাধারণত রোগের পরবর্তী পর্যায়ে বেশি দেখা যায়। পেটে কোনো অস্বাভাবিক গাঁট অনুভূত হলে নিজে থেকে কারণ অনুমান না করে চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করানো উচিত।
রক্তস্বল্পতা ও অস্বাভাবিক দুর্বলতা
কিডনি ক্যানসারের সঙ্গে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতাও দেখা যেতে পারে। এর ফলে শরীরে দুর্বলতা, ক্লান্তি বা স্বাভাবিক কাজেও বেশি অবসাদ অনুভূত হতে পারে। তবে দুর্বলতা বা অ্যানিমিয়ার কারণ অনেক হতে পারে। আয়রনের ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা অন্য নানা সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে। তাই কারণ না জেনে শুধু ক্যানসারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।

জ্বর বা রাতে অতিরিক্ত ঘামও হতে পারে
কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সঙ্গে কারণ ছাড়া জ্বর বা রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘামের মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এগুলো কিডনি ক্যানসারের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। সংক্রমণসহ আরও অনেক কারণেও এমন হতে পারে। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো কারণ ছাড়াই এসব সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন
কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন কিছু বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, পরিবারে কিডনি ক্যানসারের ইতিহাস এবং কিছু বংশগত রোগ উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ব্যথানাশক ওষুধের অপব্যবহারও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ঝুঁকির কোনো একটি কারণ থাকলেই কিডনি ক্যানসার হবে এমন নয়। আবার কোনো পরিচিত ঝুঁকি না থাকলেও এই রোগ হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
প্রস্রাবে রক্ত, দীর্ঘদিনের পাশ বা কোমরের ব্যথা, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা কিংবা পেটের ভেতর অস্বাভাবিক গাঁটের মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ রোগের মতোই হতে পারে। তাই কোনো একটি উপসর্গ দেখে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে সেটিকে অবহেলাও করা উচিত নয়। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, প্রস্রাব ও রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের মতো পরীক্ষা করতে পারেন। পরীক্ষার ফল ও ব্যক্তির অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব লক্ষণ দেখা দিলেই কিডনি ক্যানসার হয়েছে এমন নয়। কিন্তু শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি। সময়মতো পরীক্ষা করলে সমস্যার প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া